শেরপুরে যৌতুক ও নির্যাতনের মামলায় হাজত খাটার পর এবার সেই প্রতারক প্রেমিক স্বামী ইব্রাহিম খলিলের (২৮) মামলায় হুইল চেয়ারে বসেই কারাগারে যেতে হয়েছে প্রতিবন্ধী সুমাইয়া আক্তারকে (২৬)। সোমবার দুপুরে ইব্রাহিমের দায়ের করা জাল-জালিয়াতির মামলায় প্রতিবন্ধী সুমাইয়া আক্তারসহ ৫ জন শেরপুরের আমলী আদালতে স্বেচ্ছায় হাজির হয়ে জামিনের আবেদন জানালে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানী শেষে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারিন ফারজানা আবেদন নাকচ করে তাদের সকলকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্য ৪ জন হচ্ছেন সুমাইয়ার বড়ভাই আব্দুস সাত্তার (৩৫), চাচা মফিজুল হক (৫২), ভাতিজা আসাদুজ্জামান লিটন (৩৮) ও আত্মীয় শামসুল হক (৪৫)। আদালতের ওই আদেশের পর হুইল চেয়ারে বসিয়েই প্রতিবন্ধী সুমাইয়াকে প্রথমে কোর্ট হাজতে ও পরে গাড়িতে কারাগারে নেওয়ার সময় আদালত অঙ্গনে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিবন্ধী সুমাইয়ার আইনজীবী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম ভাসানী বলেন, প্রেমিক খলিল প্রতিবন্ধী সুমাইয়ার সরলতার সুযোগ নিয়ে তার জীবনের সাথেই প্রতারণা করেছে। তার তথাকথিত জালিয়াতির মামলাটি আশা করছি উচ্চ আদালতে টিকবে না এবং সুমাইয়া ন্যায়বিচার পাবে। অন্যদিকে খলিলের জাল-জালিয়াতির মামলাটিই সঠিক দাবি করে তার আইনজীবী এ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম মমিন বলেন, কেবল প্রতিবন্ধীর কথা বলে আইনে আবেগে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুমাইয়ার ২ মামলার হাজত খাটার পর এবার খলিলের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার কুমড়ি কাটাজান গ্রামের কৃষক মৃত ইকাতুল্লাহর ৭ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ শারীরিক প্রতিবন্ধী সুমাইয়া আক্তার। প্রায় ৩ বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে তার দু’পা অচল ও ক্ষীণকায় হয়ে যায়। তারপর থেকেই হাতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয় তাকে। এরপরও সে অন্যদের মতো স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করে। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ভর্তি হয় কুমড়ি তেঘরিয়া ফাজিল মাদরাসায়। ২০১২ সালের প্রথম দিকে শহরের ফার্স্ট টাইম নামে একটি কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে গিয়ে পরিচয় হয় সদর উপজেলার দীঘলদি গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে। ইদ্রিসিয়া কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থী ইব্রাহিম তখন ওই কোচিং সেন্টারে আলিম পরীক্ষার কোচিং করছিল। সেই পরিচয়ের পর সম্পর্ক এবং সম্পর্কের সূত্রে একপর্যায়ে ২০১২ সালের ১০ আগস্ট তারা বিয়ে করে। এরই মধ্যে সুমাইয়া ২০১৩ সালে দাখিল ও খলিল আলিম পাস করে এবং খলিল একই প্রতিষ্ঠানে থাকলেও সুমাইয়া এইচএসসিতে ভর্তি হয় শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজে। তাদের বিয়ের বিষয়টি জানার পর খলিলের অভিভাবকরা তা মেনে না নেয়ায় খলিল সুমাইয়াদের সংসারে গিয়েই দাম্পত্য জীবন শুরু করে। দু’জনের পড়াশোনা ও সংসার খরচে টানাপড়েনে যখন সুমাইয়ার পরিবারের কষ্ট বাড়ে, ঠিক তখন আয়েশা-আবেদ ফাউন্ডেশনে সেলাইয়ের চাকরি নেয় সুমাইয়া। সেখান থেকে প্রতি মাসে ৬-৮ হাজার টাকা পেয়ে সেই টাকাতেই সংসারে জোগানের পাশাপাশি খলিলের পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করে আসছিল সুমাইয়া। ২০১৫ সনে আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সুমাইয়া এক বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও তার খরচে খলিল পর্যায়ক্রমে মাদরাসা থেকে ফাজিল ও পরবর্তীতে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে টাঙ্গাইল থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে নেয়। এরপরই সুমাইয়া তার এক আত্মীয়ের সহায়তায় খলিলকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ম্যাটাডোর কোম্পানিতে চাকরিতে ঢুকায়। সুমাইয়ার আশা ছিল, এবার কষ্টের বোঝা কমে আসবে, নেমে আসবে দাম্পত্য জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু বিধি-বাম। উল্টো চাকরিতে ঢুকার পর থেকেই সুমাইয়ার প্রতি চরম উদাসীন হয়ে পড়ে খলিল। তার খোঁজ-খবর রাখা তো দূরে থাক, বেড়ে যায় যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। একপর্যায়ে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে খলিল জামালপুরের মিশু নামে এক মেয়েকে বিয়ে করে।
এদিকে সুমাইয়া বাধ্য হয়ে স্বামী ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট শেরপুরের সি,আর আমলী আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে এবং পারিবারিক আদালতে মোহরানা ও খোরপোষ আদায়ের দাবিতে দু’টি পৃথক মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে সমন পেয়ে যৌতুক নির্যাতন মামলায় হাজির হয়ে হাজতে গেলেও এক সপ্তাহ পর জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায় খলিল। এরপর শুরু হয় খলিলের প্রতারণার কূটকৌশল। আর সেই কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ইব্রাহিম খলিল ৫ নভেম্বর প্রতিবন্ধী সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে দীর্ঘ সাড়ে ৬ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক অস্বীকার এবং তাদের মধ্যকার বিগত ১০/০৮/১২ তারিখে সংঘটিত কাবিননামাটি জাল-জালিয়াতি বলে দাবি করে সুমাইয়া আক্তার ও তার যৌতুক নিরোধ আইনের মামলার ৪ সাক্ষীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি পাল্টা মামলা করে। আদালত বাদীর জবানবন্দি নিয়ে ঘটনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জামালপুরের পিবিআই কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআইয়ের পরিদর্শক ফারুক হোসেন সরজমিনে তদন্তে এলে সাক্ষীগণসহ আশেপাশের সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন খলিল ও সুমাইয়ার বৈবাহিক-দাম্পত্য সম্পর্কের কথা। কেবল তাই নয়, তাদের বিবাহ রেজিস্ট্রির বিষয়টি ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতীবান্ধা ইউনিয়নের মূল কাজী সৈয়দ আহম্মেদ অস্বীকার করলেও সম্পাদনকারী সহকারী কাজী আবদুল বাসেত সাক্ষ্যপ্রদানকালে তা স্বীকার করেন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে।

ওই অবস্থায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আদালত, তদন্ত কর্মকর্তার কার্যালয়সহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে প্রতিবন্ধী সুমাইয়ার ঘুরাফেরার বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এক পর্যায়ে পিবিআই কর্তৃপক্ষ তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সীমা রাণী সরকারের তদন্ত তদারকির প্রেক্ষিতে সুমাইয়াসহ অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা নেই মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর বাদীপক্ষ আদালতে নারাজী দাখিল করলে করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন পর ওই বিষয়ে শুনানী শেষে চলতি বছরের ৩ মার্চ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর আল মামুন নারাজীর আবেদন মঞ্জুর করতঃ সরাসরি সুমাইয়াসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধেই অভিযোগ আমলে গ্রহণ করে তাদের প্রতি আদালতে হাজির হওয়ার সমন ইস্যুর আদেশ দেন।




