তালাত মাহমুদ
আমাদের দেশে যখন লোকসংখ্যা কম ছিল- তখন সমস্যার অন্ত ছিলনা। আর এখন লোক সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সমস্যার মাত্রা কম। এককালে খরা, দুর্ভীক্ষ, অকাল বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছাসে জান-মাল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। একরে ২০ মণ ধান ফলাতে পারলে সেটা বাম্পার ফলন মনে করা হতো। আর এখনতো একরে একশ’ মণ ধান উৎপন্ন হচ্ছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের এই সাফল্য শুধু সন্তোষজনক নয়- বিপদজনকও বটে। কারণ- আমরা অধিক পরিমাণ ফসল ফলাতে অতিরিক্ত বিষ, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছি। অতিরিক্ত বিষ, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে ভবিষ্যতে আমাদের আবাদী উর্বর জমিগুলো অনুর্বর হয়ে যাবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বিষ, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে যেসব ফসল ফলানো হচ্ছেÑ তাতেও থেকে যাচ্ছে বিষ ও কীটনাশকের প্রাণঘাতি অনু-পরমাণু।
রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব আ.স.ম সোহেল নয়নের সাথে এসব ভয়ানক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হচ্ছিল। বুঝতে পারি তিনিও আমার মত এসব নিয়ে একাকী ভাবেন। কিন্তু প্রতিকারের সম্ভাবনা না থাকায় তিনি তার নিজের পরিবার আর আত্মীয় স্বজনকে সচেতন করেছেন। আমার ছেলে ও মেয়ে বাজারের ফল খেতে চায়না, এমনকি কলাও খেতে চায়না। ফাস্ট ফুডের খাদ্য, ক্যামিকেল মিশানো রঙিন পানীয় তাদের অপছন্দ। আমার সন্তান দু’টির এমন অনীহার কথা শুনে আ.স.ম সোহেল নয়ন খুশি মনে জানালেন, এসব তার পরিবারেও নিষিদ্ধ।
আমি বললাম, ভ্রাম্যমান আদালত দু’একজনকে শাস্তি দিয়ে এসব বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারেন না। স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে ইবোলার চেয়েও ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হবে। নয়নকে বললাম, দেশে এখন ‘মানব সম্পদ রক্ষা আন্দোলন’ গড়ে তুলতে হবে। আ.স.ম সোহেল নয়ন বললেন, তালাত ভাই, আপনি সবার মনের কথাটাই বললেন। নয়ন আমাকে জানালেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন, দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘খাদ্য আদালত’ থাকা উচিত।
দেশের খাদ্য সামগ্রী তথা শাক-সব্জী, তরি-তরকারী, ফলমূল, মাছ-মাংস, ভোজ্য তেল, মশলা, মুড়ি, এমন কিছু নেই যেখানে বিষ, কীটনাশক, ফর্মালিন বা রাসায়নিক (কেমিক্যাল) পদার্থের সংমিশ্রণ না আছে। শুটকি মাছেও ডিডিটি পাউডার দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন শুকনো খাবারেও রঙিন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। ব্যবহার করা হয় ক্ষতিকর চর্বি বা তৈলাক্ত পদার্থ। এসব ক্ষতিকর পদার্থ জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে।
সিংগাপুর এলিজাবেথ হাসপাতালে এবং ব্যাংককের বামরুথ হাসপাতালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব রোগী চিকিৎসার জন্য যায় তাদের অর্ধেকই বাংলাদেশী রোগী। বাংলাদেশের খাদ্যসামগ্রী, সবজী, ফলমূল, মাছ-মাংশ, তরি-তরকারীতে ও ভোজ্যতেলে যে পরিমাণ কীটনাশক, ফরমালিন বা রাসায়নিক (কেমিক্যাল) ও বিষ প্রয়োগ করা হয়ে থাকেÑ যা মানব দেহে মারাত্মক দূরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি করে। ফলে অল্প বয়সেই বাংলাদেশের মানুষ মৃত্যু ঝুকির মধ্যে বসবাস করছে। লিভার ক্যান্সার, কিডনী ড্যামেজ, হৃদরোগ, ব্লাড ক্যান্সার, প্যারালাইসিস, ডাইবেটিস, ব্রেন স্ট্রোক, এলার্জি, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, দৃষ্টিহীনতা, অকালে চুল পাকা, চুল পড়া, কানে কমশোনা, অকালে বার্দ্ধক্য আসা ইত্যাদি দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় কোন না কোন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পরোয়ানায় ভোগছে।
জানা যায়, দেশে অসংখ্য কীটনাশক কোম্পানী ও আমদানীকারক ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে। কোনরূপ সরকারী তদারকী না থাকায় মোনাফাখোর কোম্পানী মালিক ও আমদানীকারকরা কীটনাশক, রাসায়নিক (কেমিক্যাল) ও বিষ উচ্চমূল্যে বাজারজাত করে আসছে। এসব কোম্পানী ও আমদানীকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসিআই, আফতাব গ্রুপের সি-ট্রেড, টোটাল এগ্রো, সিনজেনটা, নোভারটিজ, আলফা এগ্রো, মেঘডোনাল, ন্যাশনাল এগ্রো, বাংলাদেশ এগ্রো লিঃ সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আমদানীকৃত বিষ ও কীটনাশক বাজারজাত করে আসছে। বিদেশীরা বাংলাদেশে বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে শুরুতে কীটনাশক ও বিষ এদেশের কৃষকদের বিনামূল্যে সরবারাহ করতো ফসলী জমিতে প্রয়োগের জন্য।
ট্যানারী বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ক্রোমিনিয়া থেকেও পোল্ট্রি খাদ্য তৈরী হচ্ছে। এসব খাদ্য খেয়ে ব্রয়লার মুরগী অল্পদিনের মধ্যে বড় হয়ে উঠে। ক্রোমিনিয়ায় যে বিষাক্ত অনু-পরমাণু রয়েছে তা ব্রয়লার মুরগীর মাংসে এবং ফার্মের ডিমে মিশে থাকে। আর তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করায় সেসব বিষাক্ত অনু-পরমাণু মানব দেহে প্রবেশ করে নানা দূরারোগ্য ব্যাধির বিস্তার ঘটাচ্ছে। বিষ, কীটনাশক, ফরমালিন, কেমিক্যাল তো রয়েছেই। ফল-মূল, মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, শাক-সবজি, ভোজ্যতেল প্রভৃতি খাদ্য সামগ্রীতে অধিক মাত্রায় বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগের কারণে একদিকে যেমন পরিবেশ বান্ধব কীট-প্রতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তেমনিভাবে নানা প্রজাতির পাখ-পাখালিরও বিলোপ ঘটছে। শালিক, দোয়েল, ঘুঘু, মাছরাঙা, সুঁইচোড়া, পারুল, ফিঙ্গে, বাবুই, ছাতারে বা সাতভাই, চড়–ই, বকসহ অনেক প্রজাতির পরিচিত পাখি এখন আর চোখে পড়ে না। বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ ও জলজ উদ্ভিদ এবং পাখির অস্তিত্ব রক্ষার্থে ‘শাইন্’ নামে একটি পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। ‘শাইন্’র নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি জানান, দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ, প্রাণী, পাখি ও মাছ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বালাই নাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে সনাতনী পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
জমিতে অতিরিক্ত বিষ, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় ফসল কাটার পরও সেসব বিষ, কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের বিষাক্ত অনু-পরমাণু জমির মাটিতে মিশে থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির জলের সাথে সেসব বিষ খাল-বিল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের বিলোপ ঘটে চলেছে। পাশাপাশি মাছের খাদ্য তৈরীতেও বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করা হয়। অনেকে পোল্ট্রি ফার্মের মুরগীর বিষ্ঠা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। অথচ এই বিষ্ঠার মাঝেও বিষাক্ত পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে। গরু মোটা-তারাকরণ ট্যাবলেট ও সিরাপের মধ্যেও রয়েছে বিষাক্ত পদার্থ। গত কোরবাণী ঈদে মোটা-তাজাকরণ বিষাক্ত ট্যাবলেট ও সিরাপ সেবন করানো অন্তত ৫০টি ষাড় গরু মারা গেছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন কোরবাণীর হাটে। এসব মোটা-তাজাকৃত গরুর মাংস দেশীয় পদ্ধতিতে লালিত-পালিত গরুর মাংসের মতো সুস্বাধু নয়। মাংসের টুকরা দেখতেও কেমন ভটকা ভটকা মনে হয়।
এসব ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আদৌ কোন খবর রাখে কিনা সন্দেহ। সরকারের পশু সম্পদ বিভাগের দায়িত্ব সম্পর্কেও পর্যবেক্ষক মহল সন্দিহান। মান্ধাতা আমলের চিকিৎসা সেবা দিয়ে বর্তমান অবস্থায় দেশের পশু সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। পশু লালন-পালন তথা হাঁস-মুরগী, ছাগল, ভেড়া, গরু ও মহিষ লালন পালনে বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষক বা পশু লালন-পালনকারীদের সচেতনতা মূলক প্রশিক্ষণ দিলে এবং কখন কোথায় কিভাবে অসুস্থ পশুকে চিকিৎসা করাতে হবে, কি ধরনের পুষ্টিকর খাবার খওয়াতে হবে এবং কিভাবে মোটা-তাজাকরণ বিষাক্ত ট্যাবলেট ও সিরাপ চিহ্নিত ও সেবনে নিষেধ করতে হবে। সে ব্যাপারে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পশু সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসি রুমে বসে না থেকে গাঁও-গেরামে গিয়ে এ সমস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। পশু-পাখি লালন-পালনকারীদের বোঝাতে হবেÑ কি করলে কি হয়। মৎস্য চাষীদের বেলায়েও একই কথা প্রযোজ্য।
দেশের ৫০ শতাংশ পশু রক্তশূন্যতায় ভোগে। কৃমি, জ্বর, পেটব্যথা, পেট ফাপা, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি রোগবালাই তো লেগেই আছে। পশুর জন্য কোন ব্লাড ব্যাংক নেই। পশুদের গায়ে কি কি গ্রুপের রক্ত থাকে সেটাও কারো জানা নেই। প্রতিদিন যতগুলো পশু জবাই করা হয়। যদি পশু সম্পদ অফিসগুলোতে ব্লাড ব্যাংক গড়ে তোলা যায় তাহলে প্রতিদিন লাখ লাখ পাউন্ড রক্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং তা অন্য অসুস্থ, দুর্বল ও রক্তশূন্য পশুদের দেহে পোশ করা যায়। পাশাপাশি পশু-পাখি লালন পালনে অতি জরুরী চিকিৎসাগুলো কৃষকদের শিখিয়ে দিলে হঠাৎ কাঁপুনি, বা লম্ফ দিয়ে বা চিৎকার দিয়ে মরে যাওয়ার আগে পশু-পাখিকে রক্ষা করা যাবে। তাতে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা হবে। বেতন হালাল করতে হলে গদবাঁধা দায়িত্ব পালন আর অনগ্রসর কর্তব্যপরায়ণতা পরিহার করে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত দায়িত্ব পালন সবার জন্যই অবশ্য কর্তব্য। পৃথিবীতে অনেক সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, অনেক মানব বসতি বিরান বধ্যভূতিতে পরিণত হয়েছে। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা, মহাস্থানগড়ের সভ্যতা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কাজেই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের কোনই বিকল্প নেই।

লেখক : কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট এর প্রধান সহকারী সম্পাদক।




