রংপুর প্রতিনিধি : রংপুর অঞ্চলের দিগন্ত জুড়ে এখন সোনালী ধানের ক্ষেতে। কাটা-মাড়াইও চলছে পুরোদমে। বলতে গেলে এ অঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজার মূল্য পাচ্ছেনা কৃষকেরা। খরচে মনপ্রতি ২’শ থেকে ৩’শ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। এতে করে হাসি ম্লান হয়ে গেছে তাদের। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ধান চাষ করে দেনা পরিশোধ করতে না পারায় কৃষকের চোখে-মুখে যেন হতাশার গ্লানি। তবে সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান বা চাল সংগ্রহ করলে তারা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব চেয়ে বেশি শস্য উৎপাদন করে খাদ্য চাহিদা পূরণে বড় অবদান উত্তরাঞ্চলের। এ বছর রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় বোরো ধান চাষের ল্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৫০ হেক্টর, গাইবান্ধা জেলায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ১২৫ হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১’শ’ হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৫৭ হাজার ৪১৫ হেক্টর, নীলফামারী জেলায় ৭৭ হাজার ৯৫৫ হেক্টর, দিনাজপুর জেলায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১’শ হেক্টর, ঠাকুরগাঁও জেলায় ৬৬ হাজার ৪১৫ হেক্টর এবং পঞ্চগড় জেলায় ৪৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমি। রংপুর জেলা থেকে এবারে ৫ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশী বোরো উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং তেমন কোন রোগবালাই না হওয়ায় ধানের ফলন হয়েছে বাম্পার। এ বছর প্রতি হেক্টরে ধানের ফলন হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৯ মেট্রিক টন। চলতি বোরো মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ ৩৪ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। যা দেশের মোট চাল উৎপাদনের ২১ ভাগ। এ বিভাগে চালের চাহিদা মাত্র ৮ লাখ মেট্রিক টন হলেও বাকি ২৫ লাখ মেট্রিক টন দেশের অন্যান্য জেলার চাহিদা মেটাতে সহায়তা করছে। এত বড় অবদানের পরও রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা ধান চাষ করে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। খাদ্য বিভাগ সরকারি ভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় না করে বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাল কেনার কারণে কৃষকরা বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না অথচ কম মূল্যে ধান কিনে ব্যবসায়ীরা চাল বানিয়ে সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেখানে মণপ্রতি ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৭শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা। সেখানে বর্তমানে মণ প্রতি ধান ৪ থেকে ৫শ’ টাকা, কোথাওবা সর্বোচ্চ সাড়ে ৫শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ না ওঠায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা এখন আরো বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষক আফজাল হোসেন জানান, নিজের ২৪ শতক জমিতে বোরো চাষ করেছেন তিনি। এতে তার ৪শ’ টাকার বীজ, জমি চাষে ৬শ’ টাকা, বীজ তোলা ও রোপণ করতে ৬শ’ টাকা, সেচ বাবদ ১ হাজার ১শ’, দু’বার নিড়ানিতে ৮শ’ টাকা, ওষুধ ও স্প্রে বাবদ ৫শ’ টাকা, সার খরচ ২ হাজার ১শ’ টাকা, ধান কাটা ও মাড়াই বাবদ ১ হাজার ৫শ’ টাকা অর্থাৎ মোট ৭ হাজার ৬শ’ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। আর ২৪ শতক জমিতে ধান হয় গড়ে ১২ মণ। এ হিসাবে বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি মণ ধানের দাম যদি ৬শ’ ৫০ টাকা হয় তাহলে কৃষকের উৎপাদন খরচ ঠিক থাকে।
চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ধান চাষ করে এখন ধার শোধ করবে কিভাবে তা ভাবিয়ে তুলছে কৃষককে। স্থানীয় হাটবাজার গুলোতে ধান নিয়ে গেলে ক্রেতা পাওয়া যায় না। জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি গ্রামের কৃষক নুরুল আমিন, ফজলে হক, সালামসহ অনেকেই জানালেন সারের দাম বেড়েছে সেই সঙ্গে জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ডিজেলসহ অন্যসব সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এমনকি ধান রোপণ করা থেকে কাটা পর্যন্ত কিষাণ মজুরদের মজুরি বেড়েছে অনেক। ধান কাটতে একজন মজুর কমপে আড়াইশ থেকে তিনশত টাকা মজুরি নেয়। অথচ ধান চাষ করে যে টাকা খরচ হয়েছে সেটাই উঠছে না।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস.এম সাইফুল ইসলাম জানান- এ বছর বোরো মৌসুমের চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ২২ ও ৩২ টাকা। ১ মে থেকে চাল কেনার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। ওই কর্মকর্তা জানান, আসলে এভাবে ধান-চাল সংগ্রহ করায় কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করার জন্য সু-নির্দিষ্ট উপায় বের করা দরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খাদ্য বিভাগ ধান কাটামাড়াইয়ের পরপরই যদি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করত তাহলে কৃষকরা একটু হলেও লাভবান হতো। যেহেতু তারা আগস্ট মাস পর্যন্ত চাল কিনবে সে কারণে বড় বড় ব্যবসায়ী কমদামে ধান কেনার আশায় ধান কেনা থেকে বিরত রয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকরা যেহেতু ধান কাটার পরপরই চড়া সুদে নেয়া ঋণ পরিশোধ করার জন্য ধান পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এ সুযোগটা নেয় ব্যবসায়ীরা। এতে তারাই লাভবান হয়, কৃষকরা নয়।
এদিকে ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবীতে হাটে হাটে ক্রয় কেন্দ্র খুলে সরকার ঘোষিত মূল্যে ধান ক্রয়, গরীব মানুষের মাঝে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা, কৃষি পণ্য উৎপাদন খরচ কমাতে সরকারী উদ্যোগে কৃষককে ভর্তূকি প্রদান করার দাবিতে সমাজতান্ত্রিক তেমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট রংপুর জেলা শাখা গত ১৭ মে সন্ধ্যায় জেলার নব্দিগঞ্জ বাজারে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্য রাখেন, বাসদ (মার্কসবাদী) রংপুর জেলা সমন্বয়ক কমরেড আনোয়ার হোসেন বাবলু, জেলা সদস্য পলাশ কান্তি নাগ।




