অধ্যাপক ইমতিয়াজ নাসেরের ক্লাস মানেই শিক্ষার্থীদের কাছে এক প্রাণবন্ত ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। জটিল আইনি ধারা কিংবা তত্ত্বকে তিনি যেভাবে জীবনের সাথে মিলিয়ে পড়ান, তাতে প্রথম সারি থেকে শেষ সারির দুর্বল শিক্ষার্থী-সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যায়। জামালপুরের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই বিভাগীয় প্রধানের ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞার সুনাম ক্যাম্পাসজুড়ে।
আজ দশম ব্যাচের প্রথম বর্ষের প্রারম্ভিক ক্লাস। নবীন শিক্ষার্থীদের পরিচিতি পর্ব চলছিল। ষাটজন শিক্ষার্থীর কোলাহলমুখর ক্লাসে দশজন ছাত্রী। পরিচয়ের ক্রমানুসারে হঠাৎ এক তরুণী দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমার নাম মেহজাবিন নাওয়ার।’
শব্দ দুটি বাতাসে ভেসে আসতেই অধ্যাপক নাসেরের হাত থেকে মার্কার পেনটি খসে পড়ার উপক্রম হলো। চশমার কাঁচের আড়ালে তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল মেয়েটির মুখে। এই অবয়ব, এই চোখের জলছবি যেন তাঁর বড্ড চেনা, বড্ড চেনা এক অলৌকিক অতীত!

বুকের ভেতরের আচমকা তোলপাড় সামলে নিয়ে ঈষৎ কাঁপানো কণ্ঠে শুধালেন, ‘তোমার বাবার নাম?’
-‘প্রয়াত ব্যবসায়ী নাইমুর রহমান নাইম।’
-‘আর মা?’
-‘দিলরুবা ইয়াসমিন ছোঁয়া।’
মুহূর্তেই ক্লাসরুমের চারপাশের সব শব্দ যেন নিভে গেল। ঘরের আর্দ্র বাতাসে বিশ বছর আগের ফেলে আসা এক চেনা সুবাস। নাসের নিশ্চিত হলেন—মেয়েটি আর কেউ নয়, এ তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই ছোঁয়ারই প্রতিচ্ছবি।
স্মৃতির পৃষ্ঠাগুলো দ্রুত উল্টে যেতে লাগল।
শেরপুর শহরের উপকণ্ঠের সেই দিনগুলো! দিনমজুর কৃষক বাবার মেধাবী সন্তান নাসের তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সের পাট চুকিয়ে গ্রামে ফিরেছেন। সেই সময়েই এক আত্মীয়ের মারফতে শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছোঁয়াকে প্রাইভেট পড়ানোর দায়িত্ব পান। সেই থেকে শুরু। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ভালোলাগা, পরীক্ষা শেষে ছোঁয়ার নাছোড়বান্দা আবদারে বিকেলে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ঘুরাঘুরি, আর শেষমেশ তা রূপ নেয় গভীর অনুরাগে।
কিন্তু সে অনুরাগের পথ দীর্ঘ হয়নি। ছোঁয়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাবার কানে পৌঁছাতেই কঠোর হাতে টান পড়ে সম্পর্কের সুতোয়। ভালো ফল করেও ছোঁয়ার আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হলো না। আর নাসের যখন বিষাদগ্রস্ত হৃদয়ে মাস্টার্স শেষ করতে ঢাকায়, ঠিক তখনই ছোঁয়াকে তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিয়ে দেওয়া হয় পার্শ্ববর্তী জামালপুরের ধনকুবের নাইমুর রহমান নাইমের সাথে।

খবরটা শুনে নাসের সেদিন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। নিজের পারিবারিক অসচ্ছলতা আর বাস্তবতার ফারাক মেনে নিয়ে ছোঁয়ার সুখী জীবনের প্রার্থনাতেই নিজের বিরহকে আড়াল করেছিলেন। মনকে ব্যস্ত রাখতে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। কিন্তু বুকের গহীনে ছোঁয়ার জন্য রাখা আসনটি কোনোদিন খালি হয়নি।
পরবর্তীতে জামালপুরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে নাসের সেখানে যোগ দেন। এর বছর সাতেক পর এক পরিচিতজনের মুখে শোনেন, ছয় বছরের এক কন্যাসন্তান রেখে নাইম হঠাৎ হৃদরোগে মারা গেছেন। খবরটি নাসেরের বুকে নতুন করে এক শেলের মতো বিঁধেছিল। স্মৃতির দহন ও কাজের ব্যস্ততায় নিজের আর সংসার পাতা হয়নি নাসেরের।
আর আজ? সেই অতীতের বিষাদ ও ভালোবাসার জলজ্যান্ত দলিল হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এই নবীনা ছাত্রী!
নাসেরের মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের এক গোধূলির কথা। সম্পর্কের সুবর্ণ সময়ে দুজন মিলে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নাম ঠিক করেছিলেন-যদি ছেলে হয়, নাম রাখা হবে ‘সাইফ’; আর যদি মেয়ে হয়, তবে ‘নাওয়ার’।
আজ নাসেরের বুঝতে বাকি থাকে না, পিতার নামের সাথে দাপ্তরিক মিল থাকলেও ছোঁয়া তার বুকের ভেতর লালন করা সেই পুরোনো ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতেই মেয়ের এই নামকরণ করেছে। হয়তো নাসেরের বর্তমান অবস্থান জেনে বুঝেই নাওয়ারকে পাঠিয়েছে তাঁরই বিদ্যাপীঠে-এক নীরব বার্তা নিয়ে।
ডিজিটাল ঘড়ির সসংকেত কাঁটা জানিয়ে দেয় ক্লাসের সময় শেষ। শিক্ষার্থীরা একে একে বেরিয়ে যায়। কিন্তু নীরব ক্লাসরুমে অধ্যাপক নাসের অপলক চোখে তাকিয়ে থাকেন দূর দিগন্তে। ছোঁয়ার ভালোবাসার এই নামান্তরের নীরব কান্না তাঁর বিবাগী মনকে এক অজানা হাহাকারে ভরিয়ে দেয়।
লেখক : কবি, লেখক ও গীতিকার।




