আচমকা এক ভাঙা সংবাদের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল কাব্যের বুকে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে একটা জীবন এভাবে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে-বিরহতাড়িত কোনো কবির কল্পনায় তা হয়তো অলংকার হতে পারে, কিন্তু বাস্তবের কাব্য তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। প্রিয়জন কবিতার এমন আত্মাহুতির খবর পেয়ে সে যখন হাসপাতালের করিডোরে পৌঁছায়, ততক্ষণে চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে এসেছে।
দু’বছর আগের কথা। শেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান কাব্য। আর শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ধনীর দুলালী ফাহমিদা ইয়াসমিন কবিতা।

শহরের এক নামী কোচিং সেন্টারের সেই মুখর দিনগুলোয় কাব্যের সাথে পরিচয় কবিতার। এই পরিচয়ে দুজনের অনাস্বাদিত এক আকর্ষণ তৈরি করেছিল তাদের নামজোড়া—কাব্য আর কবিতা। কাব্য মানুষ হিসেবে নিভৃতচারী, কিছুটা সংকোচপ্রবণ। তবে নামের সার্থকতায় সে ভেতরে ভেতরে বুনে যাচ্ছিল আধুনিক কবিতার পংক্তিমালা। অন্যদিকে রূপসী ও উচ্ছ্বল কবিতার ভেতরে যেসাহিত্যবোধের এক গোপন নদী ছিল, তা প্রথম স্পষ্ট হয় কোচিংয়ের বিদায় সন্ধ্যায়।
সেদিন সবাই যখন কৌতুক আর গানে ব্যস্ত, কবিতা হঠাৎ মঞ্চে উঠে আবৃত্তি করে বসল কাব্যেরই লেখা একটি বিরহী কবিতা। পংক্তিগুলো যখন কবিতার কণ্ঠে নিখুঁত আবেগে খেলা করছিল, তখন কাব্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে অভিনন্দন জানাতে কাব্য যখন ইতস্তত করছে, তখনই এগিয়ে এলো কবিতা নিজেই।
—‘আপনার কবিতাটি বড্ড বেশি নিজের মনে হয়েছিল, তাই না বলে বলে ফেললাম। কবি কি রাগ করেছেন?’
চোখে চোখ রেখে কাব্যের সহাস্য জবাব, ‘কবির সৃষ্টি তো পাঠকেরই আমানত। রাগ করার প্রশ্ন ওঠে কোথায়? কিন্তু লেখাটি পেলেন কোথায়?’
—‘আমাদের ঘরে নিয়মিত ‘সাপ্তাহিক দশকাহনীয়া’ পত্রিকা আসে। ওখানেই পড়া।’
—‘ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না। আপনার কণ্ঠের গভীরতা কবিতাটিকে যেন নতুন প্রাণ দিল।’
—‘কণ্ঠের গুণ জানি না, তবে লেখাটা চমৎকার ছিল। শুধু পত্রিকা কেন, আপনার সৃষ্টিকে তো আমি বহু আগে থেকেই অনুধাবন করি।’
—‘তাহলে তো বলতেই হয়, কবিতা আমার প্রাণ।’
কবিতা মৃদু হেসে চোখের আলো একটু নামিয়ে বলল, ‘আর আমি কি সেই প্রাণের একনিষ্ঠ পাঠিকা?
—হ্যা, তা তো বলাই যায়।
—আর কিছু কি ভাবা যায় না?’
—কিভাবে?
—‘কবিরা তো অনুভূতির ঈশ্বর। তারা মানুষের হৃদয় পড়তে পারেন। আমাকে কি আর আলাদা করে বলে দিতে হবে?’

ঠিক সেই মুহূর্তেই ডাক পড়ে কবিতার। তার বাবা, চাকুরিজীবী কায়ছার আহমেদ কনক এসে উপস্থিত। বিদায়বেলায় কবিতা তার নিজের তাগিদেই চেয়ে নেয় কাব্যের ফোন নম্বরটি। কাব্য নিজের আড়ষ্টতায় সংখ্যাগুলো দিতে দিতে কবিতার নম্বরটি আর চাইতে পারল না। চলতে চলতে কবিতা বলে গেল, ‘সময় সুযোগ করে আমিই না হয় ফোন দেব। কথা তো এখনো শেষ হয়নি!’
—‘পরীক্ষাটা শেষ হোক, শহরের কোনো সাহিত্য উৎসবে আপনাকে নিমন্ত্রণ জানাব।’
—‘এ দেখাই শেষ দেখা নয় কিন্তু…’
মিষ্টি হেসে বিদায় নিয়েছিল কবিতা।
পরীক্ষা শেষের পর ফোনের নিরবতা ভেঙে একদিন কবিতাই কল দেয়। তারপর গজনী অবকাশের সবুজ প্রান্তর, মধুটিলা ইকোপার্কের সুনসান পথ, আলীশানের আড্ডা আর জামালপুরের লুইস ভিলেজে কেটে যায় তাদের স্বপ্নের মতো দিনগুলো। এর মাঝেই একদিন জেলা শিল্পকলা একাডেমির এক শরৎ সন্ধ্যায় কবিতার মুগ্ধকর ধারা বিবরণী পুরো মিলনায়তনকে মোহাবিষ্ট করে রাখে।
কিন্তু মেঘ জমতে সময় লাগেনি। কিছুদিন পর ফোনে কবিতার কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘বাড়িতে আমার পাত্র দেখা শুরু হয়েছে। তোমার কি কিছু বলার আছে, কাব্য?’
কাব্য স্তব্ধ হয়ে যায়। দুজনের সম্পর্কের গভীরতা যতই ‘তুমি’তে গড়াক, দরিদ্র কৃষকের সন্তান কাব্য বাস্তবতার প্রাচীর ডিঙাতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।
—‘তুমি কি সত্যিই আমাকে পছন্দ করো, কবিতা?’
—‘এতদিন পর এই দ্বিধা? আর কার কথা শুনলে তোমার বিশ্বাস হবে?’
—‘আমি তো এক অগোছালো মানুষ। বাবার টানাটানির সংসার। কোনো একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত আমি কীভাবে নিই?’
—‘সেকথা তো আমিও বুঝি। তুমি আপাতত একটা চাকরি খুঁজে নাও। আমিও পরিবারকে বুঝিয়ে এক বছরের সময় চেয়ে নিচ্ছি।’
—‘যদি বাঁধতেই হয় ঘর, তবে তবে সেটাই যুক্তিযুক্ত।’
—‘এখনো ‘যদি’ বলছ কাব্য? সম্পর্কের এই অনিশ্চয়তা আমার সয় না।’
—‘না কবিতা, অনিশ্চয়তা নয়, তোমার এই অধিকারে আমি সত্যি আপ্লুত।’
দুমাস পর কাব্য ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে, কবিতা তার পরিবারকে সম্পর্কের কথা জানায়। কিন্তু তার অভিজাত বাবা কায়ছার আহমেদ দুই পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবধানের প্রশ্নে তীব্র কঠিন হয়ে ওঠেন। মা কোহিনূর বেগম মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গেলে বাবা সাফ জানিয়ে দেন—‘প্রয়োজনে মেয়েকে নিজের হাতে শেষ করে দেবেন, তবু ওই নিঃস্ব কবির হাতে তুলে দেবেন না।’ অবরুদ্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে রেখে কবিতাকে তার ফুফাতো ভাই রাহাত মিল্কীর সাথে বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।
সেদিন সন্ধ্যায় সেই অভিজাত বাড়ির আলো ঝলমলে থমথমে পরিবেশে হঠাৎ নেমে আসে এক হাহাকার। রক্ত হিম করা নিরবতা ভেঙে কেউ চিৎকার করে ওঠে, ‘কবিতা আর নেই!’
জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ঠান্ডা আলোর নিচে নীল হয়ে শুয়ে আছে কবিতা। কর্তব্যরত চিকিৎসক যখন এক টুকরো ধবধবে সাদা কাপড়ে কবিতার নিঃশ্বাসহীন মুখখানি ঢেকে দিচ্ছেন, তখন চারপাশের দেয়ালগুলো যেন ঘুরছিল কাব্যের চোখের সামনে। প্রিয় কবিতার এই চিরপ্রস্থানের শোক সহ্য করার শক্তি তার প্রকোষ্ঠে ছিল না। করুণ আর্তনাদের ভিড়ে হঠাৎ হাসপাতালের একই মেঝেতে ঢলে পড়ে কাব্য।
মাত্র পনেরো মিনিটের ব্যবধানে জরুরি বিভাগের ট্রলি দুটো পাশাপাশি স্থির হয়ে যায়।
হাসপাতালের করিডোরে তখন উৎসুক মানুষের ফিসফিসানি আর করুণ দীর্ঘশ্বাস। বাতাসের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে এক নিঃশব্দ হাহাকার—একজন জীবন্ত ‘কাব্য’ হয়তো প্রাণ হারাল, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য ব্যবচ্ছেদাগারে নির্মমভাবে পোস্টমর্টেম হয়ে গেল একটা তাজা ‘কবিতা’র!
লেখক : কবি, লেখক ও গীতিকার।




