ads

শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

রফিকুল ইসলাম আধার-এর ছোটগল্প ‘তুমি চলে এসো’

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক - ফটো কার্ড
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো…’
অবেলার নিঃশব্দে কিংবা শহরের কোনো কোলাহলময় ফাঁকে, আপন মনেই এই সুরটি গুঞ্জন করে ওঠেন মঞ্জুর মোর্শেদ। মঞ্জু নিজে গানের মানুষ, সুরের আলো আঁধারে শব্দের বুনন করেন। অথচ অন্যের কিংবা নিজের লেখা কোনো গানই তিনি কদাচিৎ গাইতে চান না। কিন্তু এই বিশেষ সুরটি কেন যেন কোনো নিয়ম মানে না। বারো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক জোড়া চোখের কথা মনে পড়লেই, কিংবা কোনো এক নীরব বিকেলে বুকের ভেতর হাহাকার জেগে উঠলেই-কণ্ঠ চিরে এই ডাকটি বেরিয়ে আসে। এ সুর কাকে যেন নিঃশব্দে ডেকে যায়।

Shamol Bangla Ads

বারো বছর আগের সেই দিনগুলো আজও একদম তাজা। শেরপুরে বাবার সরকারি বাসার জানালায় দাঁড়ানো স্নাতক তরুণী পাওয়েল, আর মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের স্নাতকোত্তর যুবক মঞ্জু—দুজনের স্বপ্নে ডানা মেলছিল এক নতুন ভোরের। কিন্তু বাঁধ সেধেছিল পাওয়েলের বাবার আভিজাত্যের অহংকার। বাবার কঠিন জেদের কাছে হেরে গিয়ে চোখের জলে জাফরের হাত ধরেছিল পাওয়েল। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে দেওয়া সেই বিয়ের রোদ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নেশা আর অনিয়মের সমুদ্রে ডুব দেওয়া জাফরকে সামলানো হয়নি, বিয়ের দু-বছরের মাথায় কোলে জুঁই আসলেও কিছুদিনের মধ্যেই হার্টঅ্যাটাকে মারা যান জাফর।
সেই থেকে পাওয়েল একাই এক থমকে যাওয়া সময়ের বাসিন্দা। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া মেয়ে জুঁই-ই এখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।

দিনটি ছিল জুঁইয়ের সমাপনী পরীক্ষার শেষ দিন। শহরের স্বনামধন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়টির আঙিনায় তখন অভিভাবকদের প্রচণ্ড ভিড়। হঠাৎই সেই ভিড়ের মাঝে মঞ্জুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে পাওয়েল। এতগুলো বছর পর… একদম চেনা মানুষটা কেমন যেন অন্যরকম গম্ভীর!
পাওয়েলই প্রথম নীরবতা ভাঙল, গলাটা কিছুটা কেঁপে উঠল তার, ‘কেমন আছো কবি?’
মঞ্জু একটু থমকালেন। তারপর চোখের দৃষ্টি দূরে রেখে মৃদু হাসলেন, ‘এইতো… বেঁচে আছি। তুমি?’
-‘বড্ড সুখে আছি।’Ñ কথাটা বলতে গিয়েও পাওয়েল চোখ দুটো অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
-‘কিন্তু তোমার এই চোখ দুটো তো সে কথা বলছে না, পাওয়েল। আর তোমার জীবনের কতটা খবর আমার অজানা থাকে বলো?’ মঞ্জুর কণ্ঠজুড়ে বিষাদ আর সূক্ষ্ম অধিকারের সুর।
পাওয়েল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আমার সেই অহংকারী বাবাটাও কিছুদিন আগে ঢাকায় মারা গেছেন। রিটায়ার্ড করার পর থেকে ওখানেই ছিলেন।’
-‘খবরটা জানতাম না…’
-‘থাকগে, তুমি এই অভিভাবক আর বাচ্চাদের ভিড়ে হঠাৎ?’
-‘ভাতিজা পরীক্ষা দিচ্ছে। ওকে নিতে আসা।’
পাওয়েল একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘নিজের কোনো সংসারের কথা ভাবলে না আজও?’
মঞ্জু এবার পাওয়েলের চোখের দিকে তাকালেন, ‘আর সংসার! তুমি তো সংসার করেছিলে, কী পেলে?’
-‘কেন? এই যে জুঁই আছে। ওকেই তো পেয়েছি।’ পাওয়েল কণ্ঠ শক্ত করার চেষ্টা করল।
-‘এ তো তোমার কষ্ট লুকানোর একটা দেয়াল, পাওয়েল।’
‘তোমার বুঝি কষ্ট নেই?’

Shamol Bangla Ads

মঞ্জু হালকা হেসে বললেন, “আমি যে কবির নামে বাঁধি-‘আধার’, আমি তো পাত্র বা ধারণ করার মানুষ; আঁধার বা অন্ধকার তো নই।”
-‘তুমিও না! আজও সেই আগের মতোই কাব্যিক কথা বলা ছাড়লে না।
-‘কাব্য তো মানুষের হৃদয় থেকেই জন্ম নেয়, পাওয়েল।’
পাওয়েল মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু সেই মানুষটা তো সাধারণ কেউ নন… তিনি কোনো এক পোড়খাওয়া মনের মানুষ।’
মঞ্জু একটু ঝুঁকি নিয়ে বললেন, ‘তুমি তো কম কাব্যিক নও। একজন নির্মোহ কবির পাশে দীর্ঘদিন হেঁটেছ বলেই কি এই অভিজ্ঞতা?’
-‘হতে পারে… একজন কবির হাত ধরে হাঁটার স্মৃতি কি অত সহজে মোছা যায়?’ পাওয়েলের দৃষ্টি তখন মাটির দিকে।
-‘তবে শোনো, সেই নির্মোহ কবি যদি আজও কোনো লোভ না রেখে, শুধু তোমার ভাঙা হাত দুটো ধরে পথ চলতে চায়… তবে তাকে তুমি কী বলবে?’
পাওয়েল চমকে উঠে তাকাল। বুকটা ধক করে উঠল তার। সামলে নিয়ে বলল, ‘এ কী বলছ মঞ্জু! আমার অতীত আছে, সন্তান আছে… হাজারটা সামাজিক সীমানা আছে।’
-‘জানি। কিন্তু তোমার একা পথচলার কষ্টটা যে আমাকে আজও প্রতিরাতে তাড়া করে বেড়ায়।’
-‘প্লিজ মঞ্জু… আমার এই ভাঙা তরীকে তোমার জীবনের পাড়ে ভিড়িও না। বরং তুমি অন্য কাউকে নিয়ে নিজের একটা সংসার করো।’
-‘তুমি ছাড়া অন্য কাউকে এই হৃদয়ে জায়গা দেওয়া যে অসম্ভব, পাওয়েল।’
-‘কিন্তু বাস্তবতা তো মানতে হবে মঞ্জু…’
-‘আমার বাস্তবতায় কেবল তুমিই আছো। এটাই শেষ সত্য।’
ঠিক তখনই পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বেজে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে স্কুলের মাঠ ভরে উঠল বাচ্চাদের হইচই আর অভিভাবকদের ব্যস্ততায়। ভিড়ের স্রোতে দুজনে যেন একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগলেন।
ভাতিজাকে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেও মঞ্জুর চোখ দুটি তখন পাওয়েলকেই খুঁজছিল। তাঁর মন ভেসে যাচ্ছিল পুরোনো দিনগুলোতে-পদ্মবিলে নৌকায় বসে শাপলা তোলা, হাতে হাত রেখে সেই নিশ্চুপ হেঁটে চলা… আর ঠিক তখনই বুকের খুব গভীর থেকে একটা চেনা সুর তীব্র হয়ে ফিরে এলো-
‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো……’

লেখক : কবি, লেখক ও গীতিকার।

Need Ads