ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে শেরপুরের প্রধান প্রধান নদনদীর পানি। ২০ জুলাই সোমবার সকালে নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী ও ঝিনাইগাতীর মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে সকালে নালিতাবাড়ীর বাঘবেড় ইউনিয়নের সন্ন্যাসীভিটা নয়াপাড়া গ্রামের একটি স্টিল ব্রিজ পানির তোড়ে ভেসে যায়। ওইসময় ব্রিজের ওপর শিশুসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নদী পাড় হচ্ছিলেন। পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজের সাথে তারাও ভেসে যান। তবে কিছুদূর পর শিশুসহ সকলেই নিরাপদে তীরে উঠতে সক্ষম হন। স্থানীয় বাসিন্দা হারুন রহমান জানান, সকালে পানির তীব্রতার কারণে ব্রিজটি ভেঙে যায়। তবে ব্রিজের ওপর থাকা সকলেই নিরাপদে তীরে উঠেছেন।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৩২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বিকেলে তা ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও সোমেশ্বরী ও মহারশি নদীর পানিও বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে, ভোগাই নদীর পানি নাকুগাঁও পয়েন্টে বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং নালিতাবাড়ী পয়েন্টে মাত্র ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৩১৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার নাকুগাঁও পয়েন্টে ২৪ মিলিমিটার, নালিতাবাড়ী পয়েন্টে ২৪ মিলিমিটার এবং শেরপুর পয়েন্টে ২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নেমে যাওয়ার আশা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
এদিকে পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝিনাইগাতী সদর বাজার প্লাবিত হয়েছে। একইসাথে নিম্নাঞ্চলে ক্রমান্বয়ে পানি বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নালিতাবাড়ীর কলসপাড় ইউনিয়নের গোল্লারপাড় এলাকায় শেরপুর-নালিতাবাড়ী সড়কে কয়েকদিন আগের ভাঙা স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তার পাশেই নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ওই পথে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া উপজেলার যোগানিয়া ও কলসপাড় ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর ও মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা এলেই ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। প্রায়ই কৃষিজমির ফসল, মাছের ঘের, গবাদিপশু এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
নালিতাবাড়ীর কলসপাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, প্রতিবছরই এমন পাহাড়ি ঢলে আমাদের রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও পুকুরের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। আজকেও নালিতাবাড়ী-গাজীরখামার সড়কে কয়েক ঘন্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। এখন হালকা যানবাহন চললেও ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে নদীখননসহ টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-আমীন বলেন, ঝিনাইগাতী উপজেলা ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় উজানে বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড়ি ঢলের পানি খুব দ্রুত এ অঞ্চলের নদ-নদীতে নেমে আসে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী সোমবার সন্ধ্যায় জানান, গত ২৪ ঘণ্টার টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে জেলার সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তবে এখন পানি ধীরে ধীরে কমা শুরু হয়েছে। চেল্লাখালী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আরও বৃষ্টি হলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের পরিধি বাড়তে পারে।




