অনেকটা কাকতালীয়ভাবে বদলিজনিত কারণে একই দিন বিদায় নিচ্ছেন আমাদের শেরপুরের ২৬তম জেলা প্রশাসক (ডিসি) সাহেলা আক্তার এবং পুলিশ সুপার (এসপি) মো. কামরুজ্জামান বিপিএম। ২৪ জুলাই সোমবার এ জেলায় তাদের শেষ কর্মদিবস। ২০২২ সালের ৩০ মে অর্থাৎ মাত্র ১৪ মাস আগে শেরপুরে যোগদান করেছিলেন সাহেলা আক্তার। আর একই সালের ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ প্রায় ১০ মাস আগে যোগদান করেছিলেন পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান বিপিএম। সরকারের মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনে সাম্প্রতিক রদবদলের আওতায় আদেশ মোতাবেক তাদের বিদায় নিতে হচ্ছে। বদলিমূলে ডিসি সাহেলা আক্তার উপসচিব হিসেবে যাচ্ছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। আর এসপি মো. কামরুজ্জামান বিপিএম পুলিশ সুপার হিসেবে যাচ্ছেন জামালপুরে।

এদিকে তাদের বদলিকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ যাবত প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের তরফ থেকে তাদেরকে জানানো হচ্ছে ফুলেল শুভেচ্ছা। কোন কোন ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে বিদায় সংবর্ধনা। ওইসব শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে শেরপুরে স্বল্পকালীন সময়ে একজন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার হিসেবে তারা বিভিন্ন মহলে কতোটা স্থান করে নিয়েছিলেন। মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনার সমীকরণে প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করেছিলেন। ইত্যকার বিষয় নিয়ে সম্যক আলোকপাত করতেই আজকের নিবন্ধ ‘ ডিসি-এসপির বদলি ॥ প্রত্যাশার সমীকরণে প্রাপ্তি’।
সাংবাদিকতা জীবনের দীর্ঘ ৩ যুগ পেরিয়ে চতুর্থযুগে পা রাখার সুবাদে এবং প্রেসক্লাবের মতো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের আরও দু’দফায় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাধে আমার পক্ষে বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ জেলা প্রশাসনের অনেক শীর্ষ কর্তাদের অনেকটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. নাসিরুজ্জামান, মোহাম্মদ জাকীর হোসেন, ডা. পারভেজ রহিম, ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন, আনার কলি মাহবুব, মো. মোমিনুর রশীদ ও বিদায়ী জেলা প্রশাসক সাহেলা আক্তার। তাদের সাথে আমার সম্পর্কটাও ছিল অনেকটাই মধুর। আর তাদের দু’একজনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সবাই যেন ছিলেন কর্মপাগল এবং নান্দনিক শেরপুর গড়ার কারিগর। সেই সম্পর্কের সূত্রে প্রায় সকলের সাথেই এখনও যোগাযোগটা রয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, তাদের মধ্যে নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে আনার কলি মাহবুবের মতো সাহেলা আক্তারকে নিয়েও প্রথমে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই যতটা হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন, তিনি সেই হতাশা স্বল্প সময়েই ভেঙ্গে দিয়ে একজন পরিচ্ছন্ন ও কর্মোদ্যোগী প্রশাসক হয়ে ওঠেছিলেন। সেই সাথে কাজের মধ্য দিয়ে একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে ততটাই সার্বজনীন ও জনবান্ধবও হয়ে ওঠেছিলেন। তবে জেলা প্রশাসক হিসেবে সাহেলা আক্তারের যোগদান ও যাত্রায় অনেকেই সন্দিহান হলেও আমি প্রথম থেকেই আশাবাদী ছিলাম এজন্য যে, তিনিও আনার কলি মাহবুবের মতো একজন চৌকস-কর্মঠ জেলা প্রশাসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবেন। হ্যা, তুলেছেনও তাই।

সাহেলা আক্তারের যোগদানের পর প্রথমে কিছু কিছু সভা-সেমিনার/অনুষ্ঠানে অনেকটা ভিন্ন স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের বলে মনে হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি জেলা প্রশাসক হিসেবে নিজেকে বেশ মানিয়ে তোলেন। সকাল থেকে প্রাত্যহিক অফিস দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতি বুধবার গণশুনানী এবং প্রায়ই খেলার মাঠ থেকে শুরু করে জেলা সদর থেকে উপজেলা কিংবা কোথাও বা তৃণমূলেও ছুটে যেতে পিছপা ছিলেন না। আগ্রহ-উদারতা ও কর্ম স্পৃহা তাকে ক্রমেই সাহসী করে তোলে। আর ওই অবস্থায় ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলশীমালার সুগন্ধে’ বিমোহিত সীমান্তবর্তী প্রান্তিক জেলা শেরপুরের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার সমীকরণে তার কাছে আমাদের তথা শেরপুরবাসীর প্রত্যাশা তুলে ধরতে আমার লেখা ‘ডিসি সাহেলা আক্তারের যাত্রা : সমস্যা-সম্ভাবনার সমীকরণে প্রত্যাশা’ প্রকাশিত হয়।
সেই প্রত্যাশায় ছিল নান্দনিক শেরপুর গড়তে জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শহরের তীব্র যানজট নিরসন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, ডিসি উদ্যান ও লেকের উন্নয়ন, ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা, নদ-নদী,জলাশয়-জলাধার রক্ষা, অবৈধ পাহাড় কাটাসহ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধকরণ, ভেজাল বিরোধী অভিযান, নির্মাণ কাজে তদারকি, নির্বাহী বিভাগের আওতায় বিচারিককাজে গতি ও রেভিনিউ খাতকে কলুষমুক্তকরণ, উন্নয়ন সমন্বয় নিশ্চিতকরণ, সবুজায়ন, পর্যটনক্ষেত্র সমৃদ্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, হাতি-মানুষ দ্বন্দ্বের নিরসন, তৃণমূল থেকে জাগাতে হবে ক্রীড়াঙ্গণ, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে নজর, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোন বাস্তবায়ন, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও রেলপথ বাস্তবায়ন প্রভৃতি। বলা যায় প্রত্যাশার সকল ক্ষেত্রেই কাজ করেছেন তিনি। শতভাগ সফল না হলেও অর্জন অবশ্যই সন্তোষজনক। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যাশার বাইরেও রয়েছে তার অনেক অর্জন। যেমন তুলশীমালা চালকে জিআই পণ্যে নিবন্ধনপ্রাপ্তি, কাটাখালি ব্রিজ এলাকায় স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত শহীদ নাজমুলের ম্যুরালসহ চত্বর স্থাপন, জগৎপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রবর্তন, জেলাকে ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল ই-হাজিরার প্রবর্তন, সর্বোপরি জনসেবায় জনহাসি নিশ্চিত করতে তার প্রচেষ্টা ছিল প্রাণান্ত। এ নিয়ে তার মেয়াদে ‘পর্যটনের আনন্দে তুলশীমালার সুগন্ধে শেরপুর : জনসেবায় জনহাসি’ শিরোনামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তার ওইসব জনহিতকর কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে তিনি আকৃষ্ট করে তাদের মনে স্থান করে নিয়েছিলেন। যে কারণে তার বদলিজনিত বিদায়ে বিভিন্ন মহল তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় অভিসিক্ত করেছেন। সবাই চেষ্টা করেছেন তার কর্মের স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতে।
অন্যদিকে পুলিশ সুপার হিসেবে শেরপুরে যোগদানের পরই সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের সাথে মতবিনিময় সভার মাধ্যমে প্রথমেই ‘১০০ দিনের পরিকল্পনা’ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছিলেন মো. কামরুজ্জামান বিপিএম। তার ১০০ দিনের সেই পরিকল্পনায় ৭টি বিষয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে ১. মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ, ২. সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টিকারী অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, ৩. স্পেশাল রেসপন্স টিম (এসআরটি) গঠন, ৪. টক টু এসপি সেবা (হট লাইন) চালু, ৫. আপনার এসপি আপনার কাছে কার্যক্রম চালু, ৬. মাসিক পুলিশ বুলেটিন চালু ও ৭. মামলা তদন্তে বিশেষ টিম গঠন। তার ওই ঘোষণা সত্যিই কেবল ব্যতিক্রমই নয়, বরং তা রীতিমত বিস্ময়কর, বিরল ও সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। তবে ঘোষণার পরপরই পুলিশের সার্বিক কর্মকাণ্ডে এসেছিল নতুন গতি। পরবর্তীতে তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল হয়ে শান্ত শেরপুর গড়ার ক্ষেত্রে সার্বিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
একজন চৌকস, মেধাবী ও কর্মউদ্যোগী স্বপ্নসারথী কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তিনি জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাদক, জুয়া, ইভটিজিং, গুজব ও নারী নির্যাতনসহ সার্বিক অপরাধ দমনে সফল হন। পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জেও মেলে তার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। আইন-শৃঙ্খলার বাইরেও তিনি আদর্শিক চেতনায় ছুটে চলেছেন তৃণমূল পর্যায়ে। তারই আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন, সোহাগপুর বিধবাপল্লী ও জগৎপুর বধ্যভূমি পরিদর্শন ও সহায়তার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকালীন সদর উপজেলার সূর্যদী গ্রামে সংঘটিত ঐতিহাসিক সূর্যদী গণহত্যার ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে জানান দিতে তৈরি করেন নাটক ‘সূর্যদীর গল্প’। নাটকটির একাধিক সফল মঞ্চায়নে তিনিসহ জেলা পুলিশ পায় ব্যাপক প্রশংসা। এছাড়া শেরপুরের তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যক্তিগত অর্থায়নে ১৫ শতক জমিতে কবরস্থান প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার পাশাপাশি সবশেষে ‘জয়বাংলা টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট-২০২৩’ এর সফল আয়োজনেও তিনি ছিলেন কেবল ক্রীড়াঙ্গন নয়, দায়িত্বশীল বিভিন্ন মহলেই সমাদৃত।
কাজেই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে জেলা প্রশাসক হিসেবে সাহেলা আক্তার ও পুলিশ সুপার হিসেবে মো. কামরুজ্জামান বিপিএম শেরপুরকে নান্দনিক ও অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরতে যেভাবে নিরলস কাজ করেছেন, তাতে প্রতীয়মান হয় এ জেলাকে যেন তাদের নিজেদের জেলার মতো করেই দেখেছেন। কাজ করেছেন সুন্দর ও শান্তভাবে সাজাতে। তাই সবার প্রত্যাশা, তারা নিজ নিজ মেধা, যোগ্যতা ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে আগামী দিনে সরকারের আরও গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদে আসীন হবেন। শেরপুরবাসীসহ সবার প্রত্যাশা পূরণ করবেন। বিদায়ক্ষণে শুভেচ্ছা নিরন্তর তাদের প্রতি।
লেখক: সম্পাদক-প্রকাশক, শ্যামলবাংলা২৪ডটকম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক দশকাহনীয়া, নবনির্বাচিত সভাপতি, শেরপুর প্রেসক্লাব।




