প্রাণীসম্পদ বিভাগ জানে না রোগের নাম!
শেরপুরের দুধগ্রাম খ্যাত এক পল্লীতে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে অর্ধশতাধিক গরুর। সদর উপজেলার তিলকান্দি গ্রামে গত এক মাসে স্থানীয় খামারে ওইসব গরুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয় দুগ্ধখামারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও প্রাণীসম্পদ বিভাগ রয়েছে উদাসীন। তার দপ্তরেও নেই মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান। এছাড়া তারা এখনও জানে না ওই রোগের নাম- এমন অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের।

জানা যায়, এক সময় অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতো শেরপুর সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পল্লী তিলকান্দি এলাকার মানুষ। পরবর্তীতে ওই এলাকার লোকজন তাদের অভাব-অনটন ঘুচাতে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে শুরু করে গাভী পালন। দুধ বিক্রি করে ধীরে ধীরে লাভবান হতে থাকে এলাকার অধিকাংশ পরিবার। এক পর্যায়ে সেখানে গড়ে উঠে ছোট বড় ২৪৭টি দুগ্ধ খামার। ফলে অল্প কিছুদিনেই ওই গ্রামের উৎপাদিত দুধ জেলা সদরের মোট চাহিদার বেশিরভাগের যোগান দিতে থাকে। আর এ কারণে ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গ্রামটিকে দুধগ্রাম হিসেবে ঘোষণা করে প্রাণীসম্পদ বিভাগ। বর্তমানে এখানকার উৎপাদিত দুধ জেলার চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের জেলাতেও যায়।
তবে সম্প্রতি অজানা এক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে ওইসব খামারের অনেক গরু। কারোর মারা গেছে ৩টি, কারোর বা ২টি, আবার অনেকেরই মারা গেছে একটি করে গরু। এর মধ্যে স্থানীয় সুতারবাড়িতেই মারা গেছে অন্তত: ১৫টি গরু। প্রাণীসম্পদ বিভাগের লোকজনকে ডেকেও কোন সমাধান পায়নি খামারীরা। ফলে সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে ওইসব খামারের গরু। কোন কোন সময় চিকিৎসা সেবা পেতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই। সরেজমিনে গেলে কথা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের সাথে। তাদের দাবি, গত এক মাসে অর্ধশতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে, যার মূল্য প্রায় কোটি টাকার উপরে।

তিলকান্দি গ্রামের দুগ্ধ খামারী আবুল হাশেম বলেন, গরুর দুধ বেইচাই সংসার খরচ আর পোলাপানের পড়াশোনার খরচ চালাইতাম। কিন্তু গরু ৩টা মইরা যাওয়াতে খুব ঝামেলায় পইড়া গেছি। একই এলাকার খামারী শাহজামাল মিয়া বলেন, আমার ৩টি গরু মারা গেছে। ডাক্তারদের খবর দিলে তারা সময়মতো আসে না। সরকারিভাবে কোন ধরনের চিকিৎসা সহযোগিতা পাইনি আমি। আমার গোষ্ঠীরই প্রায় ১৫টি গরু মারা গেছে। এখন আতঙ্কে জীবিত গরুগুলোও বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছি। সরকার আমাদের সহযোগিতা না করলে খামার টিকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাবে। তিলকান্দি পূর্বপাড়া গ্রামের আরেক খামারী আজিজুল হক বলেন, দশ মিনিটের মাথায় আমার ২টি গরু মারা গেছে। গরু ২টার দাম কমপক্ষে ৬ লাখ টাকা হবে। আমি এখন এই ক্ষতি কি দিয়ে কাটিয়ে উঠবো মাথায় আসে না। সরকারিভাবে চিকিৎসা পাই নাই। বরং সরকারি ডাক্তার আনলে ৩/৪ হাজার টাকা ভিজিট দিতে হয় তাদের। একই কথা জানান ক্ষতিগ্রস্ত খামারী স্বপ্না বেগম, খাদিজা বেগম, মুক্তার আলী, নাজিম মিয়াসহ অনেকেই।
তিলকান্দি দুধগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী বলেন, এই গ্রামে অন্তত: ৭০টি গরু মারা গেছে। অথচ প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তারা বলতেই পারেন না গরুগুলো কি রোগে মারা গেছে। রোগটা জানলে পরে তো চিকিৎসা করতে পারতাম। এলাকার সবাই গরিব মানুষ, এমন করে গরু মারা গেলে তারা কি দিয়ে চলবে? এখন খামারিরা কিভাবে টিকে থাকবে আল্লাহই জানে। সরকার থেকে সহায়তা না করলে আমরা চলব কি দিয়ে।
এদিকে সদর উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পলাশ কান্তি দত্তের বিরুদ্ধে চিকিৎসা দিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন খামারিরা। একইসাথে তার কাছে মাত্র চারটি গরু মৃত্যুর তথ্য থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন খামারীরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এতগুলো গরু মারা যায়নি। চারটি গরু মারা গেছে, এর মধ্যে ৩টির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গরুর চিকিৎসায় কোন ধরনের টাকা নেয়া হয়নি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের দাম নেওয়া হয়। লোকবল সংকটের কারণে সবাইকে চাইলেও সবসময় সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না বলে তার দাবি।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সদর উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা এ বিষয়ে আমাকে কিছুই জানাননি। আমি আজ (শনিবার) সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে বিস্তারিত জেনে ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। যদি তার দপ্তরের কোন কর্মকর্তার গাফিলতি থাকে, তবে তার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।




