‘ওঠ মুসলমান ভাই-বোনেরা, শেষ রাতের খাবার খেয়ে নাও তোমরা’-এমন সুরেলা গজল গেয়ে গভীর রাতে আজও রোজাদারদের জাগিয়ে তোলে বিশেষ কাফেলার দল বা কাফেলা পার্টি। ইসলামি ভাষ্যমতে, মুসলিমদের ফরজ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিয়াম বা রোজা। এজন্য বছরের সেরা মাস বলেও অভিহিত করা হয় রোজার মাসকে। অন্যদিকে আরবী কাফেলা শব্দের অর্থ জমায়েত বা সমাবেশ। আর সেই রমজানে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর কাজটি যে স্বেচ্ছাসেবক দলটি করে থাকে, তাদেরকেই কাফেলা পার্টি বলতে শোনা যায়।

এক সময় রমজান মাসে অর্থাৎ প্রথম রোজার আগের রাত থেকে শুরু করে শেষ রোজার আগের রাত পর্যন্ত কেবল প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নয়, শহরের অলি-গলিতেও নিয়মিত কাফেলার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। ‘কাসিদা’র কাফেলা ছিল প্রাচীনকালের ঐতিহ্য। এরপর দিনমান পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যায় কাফেলার রকম-ফের। দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী কাল থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দেখা গেছে, ২০/২৫ জন লোক দল বেঁধে এবং তাদের এক বা একাধিক জনের মুখে টিনের চোঙ্গা বা টিনের হর্ণ লাগিয়ে পাড়ায়-পাড়ায়সহ শহরের এলাকাতেও রোজাদারদের ডাকাডাকিসহ গজল গেয়ে কাফেলা পার্টি করতেন। সময়ের তালে ক্রমশ: সেই কাফেলাতেও আসে পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১০/১৫ জন লোক মিলে নিজেদের শান্তির ঘুমকে উৎসর্গ করে সময়টা কাজে লাগায় রোজাদার মুমিন ব্যক্তিদের জন্য। তারা কখনও বাইসাইকেলে বা ভ্যানে, রিক্সায় বা ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সায় মাইক তুলে মাউথ পিস দিয়ে রমজানের সাথে সম্পর্কিত বা আল্লাহ ও নবী রাসূলের গুণকীর্তনমূলক অনেক সুরেলা গজল গেয়েই রোজাদারদের জাগানোর মহৎ কাজটি করে আসছেন। সেই কাফেলার দল থেকে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে কখনও বা উচ্চারিত হয়,‘…….কাফেলা পার্টি দিচ্ছে ডাক, মাহে রমজান পালন কর। ……..ভাইকে জানাই সালাম’। আবার রমজানের শেষ পর্যায়ে তারা গেয়ে উঠেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পংক্তি’ ‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, আসমানেতে বিলিয়ে দে আজ আসমানির তাগিদ’।
যুগযুগ ধরে চলে আসা ওই কাফেলায় এক সময় বৈচিত্র্য ছিল ‘কাসিদা’। আরবি শব্দের বিবর্তিত ফারসি রূপ কাসিদার অর্থ হচ্ছে কবিতার ছন্দে প্রিয়জনের প্রশংসা করা। কাসিদা মূলত একটি কোরাস সঙ্গীত। মোগল আমলে দেশের রাজধানী পুরাতন ঢাকায় কাসিদার প্রচলন ঘটে। ঢাকার সুবেদার-নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় কাসিদা গাওয়া হতো, যা এলাকায় পঞ্চায়েতদের সহযোগিতায় টিকে ছিল। পুরাতন ঢাকায় রমজান মাসে সেহরীতে মুসলমানদের ঘুম ভাঙ্গাতে মহল্লায়-মহল্লায় দল বেধে কাসিদা গাওয়া ছিল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। আগেরকার দিনে সারা মাসজুড়ে পাড়ায়-পাড়ায় কাসিদার সুরেলা কন্ঠে সেহরীতে ঘুম ভাঙতো রোজাদারদের। কিন্তু আজ পরিবর্তিত অবস্থায় পুরাতন ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঐতিহ্যের সেই কাসিদা কেবল এখন নিয়ন্ত্রিতই নয়, বরং বলা যায় তা বিলুপ্তপ্রায়।

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ যুগে অর্থাৎ তথ্য প্রযুক্তিগত নানা সুযোগ-সুবিধার সুবাদে তথা কালের বিবর্তনে কেবল ঐতিহ্যের সেই কাসিদার কাফেলাই নয়, এখন রমজানে খোদ কাফেলার দলের প্রচলনটাই প্রায় অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। দুই বা ক্ষেত্রমতে এক যুগ আগেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিকভাবে বা স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের তরফ থেকে রমজানে কাফেলার ব্যবস্থা হতো। তাতে অংশ নিতেন কেবল স্থানীয় মধ্যবয়সী ও যুবকরাই নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে বয়স্ক কিছু ব্যক্তিসহ প্রায় ২০/৩০ জন লোক। রাত ২ টা থেকে শুরু করে সেহরীর প্রায় আধ ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ টানা প্রায় দুই/আড়াই ঘন্টা পর্যন্ত চলত তাদের নিয়মিত প্রচার কাজ। কিন্তু কালের আবর্তে এখন তার সবই যেন স্বপ্নের অতীত হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সুবাদে এখন সেহরী খেতে ঘুম থেকে জাগতে বাসায় বাসায় রক্ষিত দেয়াল-টেবিল ঘড়ি বা মোবাইলে এ্যালার্ম শুনে বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাইরেন শুনে বা কোন-কোন এলাকার মসজিদ থেকেও মাইকের বিশেষ সাইরেন শুনে ইফতারের পাশাপাশি প্রস্তুতি নেওয়া হয় সেহরীর। যে কারণে অন্যান্য জেলা শহরের মতো শেরপুর শহরে খুব একটা প্রয়োজন না পড়ায় এবং সম্প্রতি অতি শব্দ দূষণের পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নে স্থানীয় অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত পরিসরে কাফেলা পার্টি হচ্ছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করার মতো অবস্থা বা সচেতনতা গড়ে না উঠায় কোন কোন পাড়া-মহল্লায় সেই কাফেলা পার্টি হচ্ছে। সেই সাথে দিচ্ছে তাদের অস্তিত্বের জানান। ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা ভ্যানে মাইক উঠিয়ে সেহরী খেতে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর কাজটি করছে তারা।
অন্যদিকে মাসব্যাপী একটি অটোরিক্সা ও মাইক সেট ভাড়াসহ একটি কাফেলা পার্টির আনুমানিক খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু রোজার শেষ পর্যায় থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত তার চাঁদা কালেকশন করে যা উঠে তা দিয়ে খরচ তোলাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও অনেকটা যেন স্বেচ্ছাশ্রমের নেশায় বা সওয়াব হাসিলে ব্যাকুল হয়েই প্রতিবছর এক শ্রেণির কিছু লোক কাফেলা পার্টির আয়োজন করে আসছেন। তারা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন অতীত ঐতিহ্য।
শেরপুর অঞ্চলে বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪১টি মহল্লায় নিকট অতীতেও যখন রমজানে প্রায় অর্ধশতাধিক কাফেলা পার্টি কাজ করতো, ঠিক তখন এবার ওইসব এলাকায় এক-চতুর্থাংশ কাফেলাও নেই বললে চলে। সরেজমিনে গত ১১ ও ১২ এপ্রিল শেরপুর শহরের উপকন্ঠ গৌরীপুর, নওহাটা, দমদমা ও মোবারকপুরসহ কয়েকটি মহল্লা ঘুরে পাওয়া যায় মাত্র ৩টি কাফেলার দল। এবার অন্যান্য কিছু এলাকার মতো দমদমা কালিগঞ্জ এলাকাতেও কাফেলা পার্টি না থাকায় এখানকার প্রচারের কাজটি করছে পাশের নওহাটা কাফেলা পার্টি। হাসেম, মোহন, সুলতান, শফিকুল, রতন, শরিফ, রফিক, সাইফুল, সাদেক, সোহাগ, হীরা, আতিক, রাসেল, হানাফি ও সওদাগরসহ ১০/১২ জনকে নিয়ে প্রচারকালে নওহাটা কাফেলা পার্টির নেতা খাইরুল ইসলাম আলম ও মনোয়ার হোসেনের সাথে দেখা ও কথা হলে তারা জানান, এলাকায় পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতায় এখনও তারা সেহরি খেতে রোজাদারদের জাগাতে কাফেলা পার্টি করে আসছেন। এতে নিজেদের স্বেচ্ছাশ্রমের পরও একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও প্রচারকাজের মাইক ব্যবহারসহ মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০/২৫ হাজার টাকা। কিন্তু সে তুলনায় স্বত:স্ফূর্তভাবে সহযোগিতা দিন দিন অনেকটাই কমে আসছে। তারপরও কি পেলাম বা পেলাম না নিজেদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই কাজটা করে আসছি আমরা।
উত্তর গৌরীপুর কাফেলা পার্টির নেতা জামিল হোসেন সরকার ও মোহাম্মদ আকরামুজ্জামান প্রায় একই কথা জানিয়ে বলেন, মুমিন বান্দাদের জাগাতে পারার কাজটাতে অনেকটা তৃপ্তি রয়েছে। তবে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের তরফ থেকে সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় শহরের অনেক এলাকাতেই এখন কাফেলা পার্টি নেই। তাই আমাদেরকে এবার বৃহত্তর গৌরীপুর অঞ্চলের প্রায় ৩/৪টি মহল্লায় কাজ করতে হচ্ছে। আমরা এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাই।




