শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ে একসময় কোচ সম্প্রদায়ের রাজত্ব ছিল। হাজং ও বর্মণ সম্প্রদায়ও ছিল ধর্ণাঢ্য। বর্তমানে এ তিন সমপ্রদায়ের অবস্থা খুবই নাজুক। কৃষিকাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তারপরও উৎসবে পালনে তারা শহরের মানুষের চেয়ে পিছিয়ে নেই। অভাব-দারিদ্রতার মধ্যেও প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব তারা পালন করে। কাংশা ও নলকূড়া ইউনিয়নের রাংটিয়া, শালচ’ড়া, নওকুচি, ডেফলাই ও বড় রাংটিয়া এ ৫ গ্রামের মানুষ নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে প্রতিবছর এখানে সাড়ম্ভরে দুর্গাপূজা করে। শালচুড়া গ্রামের ভূঁইয়া বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গোৎসব।

পূজোয় অষ্টমী ও নবমী দু’রাত ধরে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কোচ-হাজং ও বর্মণ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি তুলে ধরে নাচ-গানের আসর বসে। যাতে যোগদেন হাজারো মানুষ। এ গ্রামের শতবছর ধরে চলা দুর্গোৎসবের কথা শুনে বুধবার রাতে সেখানে এলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফজলুল হক ও জেলা প্রশাসক মো.মোমিনুর রশিদ। শালচুড়া গ্রামে আসার সড়কটি চাপা ও কাঁচা থাকায় সেখানে যানবাহন চলাচল করতে সমস্যা হয়। তাই স্থানীয় পাতার ক্যাম্পে গাড়ি রেখে রাত আটটার দিকে রিকশা করে এমপি, আর পায়ে হেটে স্ত্রী-সন্তান ও জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পূজা মন্ডপে এলেন জেলা প্রশাসক।
আকস্মিক এমপি ও জেলা প্রশাসককে দেখে মুগ্ধ নৃ-তাত্তিক জনগোষ্ঠীর লোকজন। শিশুরা ফুল ছিটিয়ে গান গেয়ে বরণ করে নিলেন অতিথিদের। এমপি ও ডিসিকে পেয়ে ভীষণ খুশি স্থানীয়রা। স্থানীয় নৃত্য শিল্পি রিয়া কোচ ও বৃষ্টি হাজং তাদের ভাষায় বলছিল ‘এমপি আরো ডিসি ফায়নিনিন নিন্দারা চামা রংগ মানতেনে’ (এমপি ও ডিসি সাহেব এসেছেন আমরা খুব খুশি হয়েছি)। এর আগে এখানে কেউ আসেননি।
এরপর শুরু হলো আরতি প্রতিযোগিতা। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে চললো কোচ- হাজং ও বর্মণ ছেলে মেয়েদের নাচ- ‘মহিষাসুর বধ’ অভিনয়। এসব দেখে মুগ্ধ হন এমপি ফজলুল হক চাঁন ও জেলা প্রশাসক মোমিনুর রশিদ। শিশুদের উৎসাহিত করার জন্য তিনি ৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। ২৫ জন হতদরিদ্র মানুষের হাতে তুলে দেন ১০ কেজি করে চাল ও মাস্ক।

জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশিদ বলেন, পাহাড়ে থেকে কোনরকম সুযোগ সুবিধা না পেয়েও কোচ-হাজং ছেলে-মেয়েরা যেভাবে তাদের ভাষা-কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি বলেন, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের তরফ থেকে খুব শিগগিরই গজনীতে একটি আদিবাসি মঞ্চ করবো। যাতে এখানকার সংস্কৃতিভ্রমণ পিপাসুরা উপভোগ করতে পারে।
এমপি ফজলুল হক বলেন, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং তাদের মন্দিরটি পাকাকরণ করা হবে। তারা যাতে ভবিষ্যতেও তাদের উৎসব চালিযে যেতে পারে সেজন্য তিনি কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি নিজ তহবিল থেকে পূজারিদের হাতে ৫ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুকতাদিরুল আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ফরিদা ইয়াছমিন, ঝিনাইগাতীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আল মাসুদ, জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সভাপতি দেবাশীষ ভট্টাচার্য, ঝিনাইগাতী ঐক্য পরিষদ নেতা জীবন চক্রবর্তী, রয়েল কোচ, মিঠুন কোচ, যুব ঐক্য পরিষদ সভাপতি শান্ত রায়-সম্পাদক ইন্দজিৎ বর্মণ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।




