‘হালচাটি’ শেরপুরের ঝিনাইগাতী সীমান্তের এক অবহেলিত পাহাড়ি জনপথ। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এ গ্রামে। ফলে পরিবর্তন হয়নি আদিবাসী অধ্যুষিত অধিবাসীদের জীবন-মানের। বরং, আবাসস্থলটিই যেন এখন দুঃখ তাদের।
জানা যায়, দেশের স্বাধীনতার পর পরই সীমান্তঘেষা কাংশা ইউনিয়নের ‘হালচাটি’ গ্রামটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। গ্রামের মাঝ দিয়ে হয় কাটাতারের বেড়া। বিভক্ত হয়ে পড়েন গ্রামবাসীরা। ওই গ্রামে প্রায় অর্ধশত পরিবারের বসবাস। সবাই প্রায় আদিবাসী। তবে কোচ সম্প্রদায়েরই পরিবারের সংখ্যাই বেশি। গ্রামটির উত্তরে ভারতের ‘বারাংগাপাড়া হালচাটি’ গ্রাম। ভারত থেকে এ গ্রামের মাঝ দিয়ে নেমে এসেছে কালাঘোষা নদী। শুকনো মৌসুমে এ নদীতে থাকে হাটু পানি। বর্ষা এলে মাঝে মধ্যে আসে জোয়ার। পানিতে কানায় কানায় ভরে ওঠে নদী। কয়েকদিন বন্ধ থাকে হালচাটিসহ আশপাশের গ্রামবাসীদের চলাচল। কিন্তু ওই নদীতে আজও একটি ব্রিজ নির্মিত না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় অধিবাসীসহ আশেপাশের শত শত মানুষকে। তাদের চলাচলের সড়কটিও দু’পায়ে পাহাড়ি পথ। চলে না কোনো যানবাহন।
সরেজমিন গেলে স্থানীয় অধিবাসী, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজনের সাথে কথা বলে ওঠে আসে হালচাটি গ্রামের ওই দুর্ভোগের চিত্র। ওইসময় কথা হয় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের কৃষক সুরেন্দ কোচের সাথে। তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন অইলো। আমগোর গ্রামডা দুই ভাগ অইলো। অর্ধেক ভারতে। আর অর্ধেক আমরা। ৫০ বছর অইলো। অহনও আমরা আগের মতোই। আমগোর দুঃখ-কষ্ট কেউ দেহে না। এডা সেতুর লাইগা আমরা কত নেতা, মেম্বার, চেয়ারম্যানগোরে কইলাম। কেউ দিলো না। এডার লাইগা মেলা কষ্ট অয়’। তিনি আরও বলেন, ‘যাতায়াতের এডা পথ অয়াই পোলাপানগোরে কষ্ট আরও বেশি। কালাঘোষা নদীর ওপর এডা সেতু অইলে এই কষ্ট করতে অইবো না’।
আরেক কৃষক প্রেমানন্দ কোচ বলেন, ‘ভোট আইলে, ভোটের লাইগা অনেকে আয়ে। মেলা কতা কয়। সেতু দিবো। ভোট অইলে আর আয়ে না। এই গ্রামেরই নারী নাইবালী কোচ। তিনি বলেন, বেডা মানুষরা কাপর তুইলা যাইতে পারে। আমরাতো কাপর ভিজাইয়া যাই। এই সেতু অইলে আমগোর মেলা উপকার অইবো। তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে মাঝে-মধ্যেই জোয়ার আসে। নদীতে পানি ভইরা যায়। তহন চলাচল করতে পারি না। কোনো মানুষ অসুখ অইলে চিকিৎসাও করাতে পারি না। ছেলে-মেয়েরা পড়া লেহা করতে যাইতে পারে না। হাতির সমস্যাতো আছেই। এভাবেই আক্ষেপ করে ওই নারী আরও বলেন, আমরা কী সারাজীবন এভাবেই কষ্ট করমু ?
এলাকার এক শিক্ষক ও সমাজ সেবক যুগল কিশোর কোচ বলেন, কেউ অসুস্থ্য হলে তাকে কাধেঁ করে নিতে প্রায় এক কিলোমিটার। এর পর বর্ডার সড়ক। আমরা জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্ভোগের কথা বলি। কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি দেন। বাস্তবায়ন হয় না। তার মতে, এখানে একটি সেতু হলে, হালচাটি গ্রামসহ আশপাশের গ্রামবাসীদের চলাচলে দুর্ভোগের অবসান হবে। বদলে যাবে গ্রামবাসীদের জীবন-মান।
ঝিনাইগাতী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নবেশ খকসী বলেন, আমরাতো কোনো বরাদ্দ পাই না। চেয়ারম্যানরা উদ্যোগ নিলে ত্রাণের টাকায় সেতু করতে পারে।

এ ব্যাপারে কাংশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, আমারতো সময় শেষ। সেখানে প্রশাসনের লোকজনসহ বিজিবির সদস্যরাও চলাচল করেন। বর্ষা এলে চলাচলে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়। তবে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ এলেই সেখানে সেতু নির্মাণ হবে। অন্যদিকে, অবহেলিত গ্রামটির জীবনমান উন্নয়নে কোন উদ্যোগ না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি উর্ধতণ কর্তৃপক্ষের নজরে দেওয়া প্রয়োজন।




