স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসায় মিলছে কঠিন রোগ থেকে মুক্তি!
‘স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসায় মিলছে কঠিন রোগ থেকে মুক্তি’- এমন প্রচারণা ও বিশ্বাসে শেরপুরে জমে উঠেছে ইদু মিয়া (৫৫) নামে এক কথিত কবিরাজের ঝাড়ফুক ও তেল-পানি পড়া দেওয়ার জমজমাট কারবার। সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের ছনকান্দা কুঠুরাকান্দা এলাকার মৃত শামসুল হকে ছেলে ইদু মিয়ার বাড়িতে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। দিনের পর দিন এক শ্রেণির সাধারণ ও সহজসরল প্রকৃতির মানুষের অন্ধ বিশ্বাস ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চলছে ওই কারবার। বিষয়টিকে সচেতন মহল এক প্রকার প্রতারণা ও ভন্ডামি বলেই ভাবলেও কথিত কবিরাজ ইদু মিয়া বাগিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সও। অন্যদিকে ওই প্রতারণার বিষয়ে এখনও গড়ে উঠেনি সামাজিক প্রতিরোধ। সেইসাথে কোন পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।

জানা যায়, প্রায় ২ মাস আগে থেকে সদর উপজেলার প্রত্যন্তপল্লী ছনকান্দা কুঠুরাকান্দা এলাকায় শুরু হয়েছে কথিত ইদু মিয়ার ওই ঝাড়ফুক ও তেল-পানি পড়ার কারবার। আর ওইসময় থেকে সব ধরনের রোগ ভালো করে দিচ্ছে কবিরাজ ইদু মিয়া- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। ফলে পানির বোতল নিয়ে গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে ছুটছেন মানুষ। যে যেভাবে পাচ্ছে সেভাবে ভিড় করছে ওই কবিরাজের বাড়িতে। মানুষের ভিড় ঠেকাতে হিমশিম খাওয়ায় বাড়ির সামনে দেয়া হয়েছে বাঁশের বেড়া। শুধু তাই নয়, কবিরাজের কাছে পৌঁছতে হলে বাঁশের বেড়ায় ধরতে হবে লাইন। সূর্য ওঠার পর থেকেই শুরু হয় চিকিৎসা, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কবিরাজের বাড়ির পাশেই এক মুদি দোকান থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে তেল ও পানির বোতল।
৪ অক্টোবর সোমবার সরেজমিনে গেলে দেখা যায় ইদু মিয়ার বাড়িতে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন সমস্যায় আসা নারী-পুরুষসহ উৎসুক মানুষের ভিড়। জামালপুর সদর থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন রমজান আলী, রফিক মিয়া। তারা বলেন, মানুষের মুখে মুখে শুনেছি এখান থেকে পানি পড়া খেলে মানুষ সব রোগ থেকে মুক্তি পায়। এজন্য আমরাও এসেছি। এখন পানি নিয়ে খেয়ে দেখি কতটা কার্যকর হয়। একইভাবে ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকে বুকের ব্যথা নিয়ে আসা লাভলী বেগম বলেন, আমার আম্মার কাছে ইদু কবিরাজের কথা শুনে এসেছি। ফুঁ আর পানি পড়া খেলে নাকি ব্যথা ভালো হবে- এ বিশ্বাসেই আসা। স্থানীয় বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, কেউ বলতাছে ভালো হয়, আবার কেউ বলতাছে ভালো হয় না। তবে বেশিরভাগ মানুষ বলতাছে ভালো হয় না। এখন আমরাতো আর চিকিৎসা করাতে যাইনি। আমাদের কিছু হলে হাসপাতালে যাই।

পরে কথা হয় কথিত কবিরাজ ইদু মিয়ার সাথে। তিনি দাবি করেন, আমি একজন দিনমজুর। বিভিন্ন জায়গাতে দিনমজুরির কাজ করি। ২ বছর আগে ঘুমের মধ্যে একদিন আমাকে স্বপ্নে দেখায় ফুঁ ও পানি পড়া দিতে। তাহলে সব ধরনের সমস্যা সমস্যা হবে। কিন্তু আমি তাতে ভয় পেয়ে যাই। পরে আমি বিক্রমপুর চলে যাই। সেখানে দিনমজুরের কাজ করি। ওই অবস্থায় গত দুই মাস আগে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার পর হঠাৎ একদিন একজন প্রতিবন্ধি মানুষ আসে আমার কাছে। পরে তাকে স্বপ্নে দেখানো অনুযায়ী আমি ফুঁ ও পানি পড়া দেই। তার দুইদিন পর ওই প্রতিবন্ধি মানুষটা ভালো হয়ে যায়। ওই খবর এলাকায় জানাজানি হয়ে পড়লে মানুষের মাঝে আগ্রহ বাড়ে। এভাবেই আমার এখানে মানুষ আসতে থাকে। কি কি ধরনের রোগ দূর করতে পারেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ইদু মিয়া বলেন, ব্যথা, প্যারালাইসিস, শারীরিক প্রতিবন্ধি ও মেয়েদের গোপন সমস্যাসহ নানা ধরণের রোগ দূর করতে পারি। এজন্য টাকা-পয়সা দিতে হয় না রোগীদের। সুস্থ হলে খুশি হয়ে মানুষ যা দেয় তাই নিই।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে ভাতশালা ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুন নাহার বলেন, জরুরি প্রয়োজনের জন্য ফাঁকা ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র সাক্ষর দিয়ে ইউপি সচিবের কাছে রেখে দেই। সে যাদের ওইসব কাগজ দরকার তাদের দেয়। এ সুযোগেই হয়তো আমার অগোচরে তিনি নিয়ে গেছেন।
শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আনওয়ারুর রউফ বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন কোন চিকিৎসা নেই। এটা মূলত অপচিকিৎসা ও অবৈজ্ঞানিক। এতে রোগীর আরও ক্ষতি হতে পারে। তিনি সাধারণ মানুষকে অপচিকিৎসার বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আহবান জানান। সেইসাথে ওই বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ আল মামুন বলেন, ঝাড়ফুক ও তেলপানি দেওয়া এক কবিরাজের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




