ads

বুধবার , ২৩ এপ্রিল ২০১৪ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

কৃষির সেকাল-একাল : গরুটানা লাঙলের হালচাষ পদ্ধতি এখন শুধুই স্মৃতি

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক
এপ্রিল ২৩, ২০১৪ ৯:০৮ অপরাহ্ণ

Hal Picমোহাম্মদ জুবায়ের রহমান : কালের বিবর্তনে পালাক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতার সেই সোনালী অতীত, ঐতিহ্য ও নানা আবিস্কারের ইতিহাস। এরই একটি হচ্ছে গরুটানা হালচাষ পদ্ধতি। মানব সভ্যতার উষালগ্নে জমিচাষে কাঠের তৈরি চাঁদ আকৃতির লোহার ফলাযুক্ত লাঙল ও পশু ব্যবহারের মাধ্যমে ফলানো হত সোনালী ফসল। আর এটিই ছিল তখনকার একমাত্র চাষ পদ্ধতি। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার নিরন্তর প্রচেষ্টায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের যুগে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যাপক বিস্তার ও ব্যবহারে উন্নত কৃষি পদ্ধতির মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারছে না সেকেলে সেই জমিচাষ পদ্ধতি। ফলে প্রত্যন্ত পল­ীতেও এখন আর দেখা যায়না গরুটানা লাঙলের হাল। অতীত যেন হারিয়ে যাচ্ছে বর্তমানের গহবরে।

Shamol Bangla Ads

মানব সভ্যতা ও কৃষিতে আদিম মানুষ : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আদিম মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে শিকারের নেশায় ঘুরে বেড়াতো বনে-জঙ্গলে। একসময় তারা দেখতে পেল বন-জঙ্গলে বিভিন্ন ফলজ, বনজ, ঔষধিসহ নানা প্রজাতির ফলের বীজ মাটিতে পড়ে ও পশুপাখির বিষ্ঠায় থাকা বীজ হতে অনুরূপ আরেকটি গাছের জন্ম নেয়। এতে ফুল-ফলে ভরে উঠে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে। তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা অনুভব করল বন-জঙ্গলে ঘুরাফেরা না করে এক জায়গায় সংঘবদ্ধভাবে স্থায়ী বসবাসের। স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রারম্ভেই তারা নানা প্রতিকূলতা ও সমস্যার সম্মুখীন হলো। ধীরে ধীরে নানামুখী সমস্যা কাটিয়ে উঠার পাশাপাশি বনের পশুপাখি ধরে এনে তাদের বশ করতে থাকল। এক সময় তারা বনজঙ্গল হতে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের বীজ সংগ্রহ করে নিজেদের তৈরি শক্ত ধাতব বস্তুর মাধ্যমে মাটি খুড়ে ফসল ফলাতে শিখল। এরই এক পর্যায়ে কাঠের তৈরি চাঁদ আকৃতির লাঙল ও তাতে পশুর ব্যবহারের মাধ্যমে জমি চাষ করেÑ এক ধাপ এগিয়ে নবসভ্যতার যুগে প্রবেশ করল। এরই ধারাবাহিকতায় সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত এই চাষ পদ্ধতি বিশ্বময় চলে আসতে থাকে।

হালচাষীদের জীবনচিত্র : অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে আমাদের দেশ থেকে সেই আদি ঐতিহ্য হালচাষ পদ্ধতি হারিয়ে গেছে। আমাদের দেশে ৯০ দশক পর্যন্ত ওই হালচাষ পদ্ধতি ছিল কৃষি উৎপাদনের একমাত্র উপায়। সেই হারিয়ে যাওয়া লাঙলের হাল যারা পরিচালনা করত তাদেরকে গ্রাম্য ভাষায় ‘হাইল্যা’ বলা হত। সেই হালচাষীরা ভোররাতে উঠে প্রাথমিক সকল প্রস্তুতি সেরে কোমরে গামছা বেধে একহাতে হালের বলদের রশি ধরে, কাধে লাঙল, লাঙলের ডগায় খড়ের বেদিতে আগুন ধরিয়ে জোয়াল মই নিয়ে ধেয়ে চলত মাঠ পানে। তাদের নাওয়া-খাওয়া হত ক্ষেতের আইল-বাতরে বসেই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভোর থেকে বেলা গড়া পর্যন্ত চলত তাদের হালচাষ। অনেক সময় দ্রুত জমিচাষের জন্যে পাড়ার গৃহস্থ্যরা মিলে গাতা করে পালাক্রমে একে অপরের জমি চাষে সাহায্য করত। সারিবদ্ধভাবে জমিচাষের সময় হাইল্যারা মনের সুখে একসঙ্গে উচ্চ কণ্ঠে গেয়ে উঠত কতনা জারি, সারি, ভাটিয়ালী- ‘বাড়ির পাছে বেতের আড়া, হাল জুরাইছে দেওড়া ছেরারে; এত বেলা হয় ভাবিজান, পান্তা নাই মোর পেটেরে’। সেই বিখ্যাত ভাওয়াইয়া গান এখন আর শোনা যায়না। তাদের নিয়ে কত কবি, লেখক, গায়করা কত গান, কত ছড়া-কবিতাই না লিখেছেন।
তাদের কর্মব্যস্ত জীবন  : বেলা গড়া পর্যন্ত হালচাষ শেষে বাড়িতে ফিরে দুপুরের নাওয়া-খাওয়া শেষ করে আবার জড়িয়ে পড়ত অন্য গৃহস্থালী কাজে। রাত অবধি চলত তাদের সেইসব গৃহস্থালীর কাজ। কতই না ব্যস্ত ছিল তারা উৎপাদনমুখী কাজে। সামান্য অবসরে মাথায় গামছা বেধে হাতে পাজুন নিয়ে কণ্ঠে ভাওয়াইয়া ধরে ঘুরে বেড়াতো গ্রামময়। তাদের কোছে শোভা পেত তামাকের তৈরি বিড়ি প্যাকেট। মনের সুখে বিড়ি টেনে পেতো যেন অমৃতের স্বাদ।
হারিয়ে যাওয়ার কারণ : আশি’র দশকের শুরুতে আমাদের দেশে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু হয় সামান্যই। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষিবিজ্ঞানীরা কষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবনের কাজে হাত দেন আশির দশকের গোড়ার দিকে এবং পরবর্তীতে উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে থাকেন। ধীরে ধীরে নব্বই দশকের দিকে তার পরিধি ব্যাপক আকার ধারণ করে। বর্তমানে রাবি’র গবেষণায় ও আবিস্কারে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ২২ ধরনের যন্ত্রপাতি বাজারে রয়েছে। যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা, ব্যবহারে সুবিধা থাকায় অতি অল্প সময়ে ট্রাক্টরের মাধ্যমে জমিচাষ, ফসল মাড়াই, বস্তাবন্দি, রোপন, নিড়ানি, সার প্রয়োগ ও ফসল কাটা পর্যন্ত সবকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। তাই ক্রমাগতভাবে বদলে যাচ্ছে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিকাজের চিরায়ত চিত্ররূপ।
যেসকল কারণে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার জরুরী : আশির দশক পর্যন্ত গ্রামীন শ্রমশক্তি উদ্বৃত্ত থাকায় কৃষকরা কৃষিকাজে যন্ত্রপাতির ব্যবহারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। কারণ তখন যন্ত্রপাতি ছিল সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। ক্রয়ক্ষমতাও ছিল কৃষকদের নাগালের বাইরে। এরপর দেশে নানাবিধ শিল্প কারখানা গড়ে উঠায় ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে শিল্প-বাণিজ্য ও পরিবহণসহ সকল সেবামূলক খাতের প্রসার ঘটতে থাকায় কৃষিকাজে শ্রমশক্তির অভাব দেখা দেয়। বেড়ে যায় শ্রমের মজুরীও। এছাড়া পশুপালন ব্যয় ও নানাবিধ সমস্যার কারণে কৃষিক্ষেত্রে যন্ত্রীকরণ জরুরী হয়ে পড়ে। এব্যাপারে সরকারও এগিয়ে আসে, কৃষকরা তা সাদরে গ্রহণ করে। একদিকে শ্রমের মজুরী বৃদ্ধি, শ্রমশক্তির অভাব, অন্যদিকে দেশেই কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি হওয়া ও সহজলভ্যতার কারণে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এর বিস্তর ব্যবহারের দিকে কৃষকরা ঝুকে পড়ে। প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকাজের সময় ও শ্রম, ফসলের অপচয় কমে আসে। এতে কৃষিজমি প্রতিবছর কমলেও শস্য উৎপাদন বাড়ছে দ্বিগুণ হারে।
কৃষিতে যন্ত্রীকরণের ফলে ইউরিয়া প্রয়োগ ও ব্যবহারের সাশ্রয় হয়েছে। তেমনি কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার বাড়তে থাকায় ফসল কাটা-মাড়াই, বস্তাবন্দিকরণ ব্যয় অনেক কম ও যন্ত্রচালিত মেশিনে ফসল মাড়াইয়ের অপচয়ও অনেকটাই কমে গেছে। এভাবেই কৃষিতে যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ক্ষেত্র দিন দিন বেড়েই চলছে। কৃষিতে যন্ত্রপাতির ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদার ফলে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি তৈরির এক সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স¤প্রতি দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলায় আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি কম্বাইন হারভেস্টার তৈরি করে কৃষিতে সৃজনশীল কাজের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবহারে শ্রম-ঘাম অপচয় যতই রোধ হোক না কেন, আমাদের আদি ঐতিহ্য যে হারাতে বসেছেÑ এটা ধ্র“ব সত্য। অতীত ছাড়া বর্তমানকে স্বাবলম্বী করা কঠিন, তাই পুরাতনকে শুধুই ইতিহাসের পাতায় নয়- বাস্তবে কিছুটা হলেও ধরে রাখা দরকার। এখন যেন সবই অতীত। আজকের প্রজন্মের সেই আদি ঐতিহ্য গরুটানা লাঙলের হালের সাথে পরিচয় নেই বললেই চলে। হয়তোবা একদিন লাঙলের হাল দেখতে যেতে হবে মেলায় কিংবা জাদুঘরে।

Need Ads
error: কপি হবে না!