কবি রফিকুল ইসলাম আধারের ‘বিষাদের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থের পাঠ অনুভূতি
‘জানি, আমি মফস্বলি এক কবি
পদ্যে আঁকি মোনালিসা আর চেতনা ও
চৈতন্যহীনের কাহিনির বুনট কথন,
আমার কবিতার দুঃসাহস অশুভ শক্তি
ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে –
শব্দে নাচে চেঙ্গিস
সাত মার্চের মহাকবির বারুদ ঘ্রাণের ভাষণ’।
এই পঙক্তিটি নব্বই দশকের কবি রফিকুল ইসলাম আধার-এর চতুর্থ কাব্যগন্থ ‘বিষাদের ঘোড়া’র ‘অবস্থান’ কবিতার অংশ। এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত এই গ্রন্থে একজন কবি তাঁর নিজের লেখা কবিতাতেই তুলে ধরেছেন নিজের স্পষ্ট অবস্থান। তাঁর এই অবস্থান অবশ্য আমরা আগেই টের পেয়েছি। অর্থাৎ এটা বোঝার জন্য আমাদের কবিতাটির ৬১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। তাঁর কবিতার অবস্থান যে ভিন্ন একটি জায়গায়, বিষন্ন সুন্দরে ভরা মফস্বলের গন্ধ মাখানো অচেনা পাখির সুর- তা একের পর এক কবিতার লাইনে ফুটে উঠেছে।

রফিকুল ইসলাম আধার মূলতঃ প্রেম, বিরহ ও দ্রোহের কবি। জীবনবোধ ব্যাপ্ত করেই তাঁর নিরন্তর কাব্যচর্চা বলে তাকে জীবনবোধের কবিও বলা যায়। তাঁর কবিতা মূলত আধুনিক ছন্দ ও রূপকের নিপুণ বুনন। তাঁর কবিতার একটি বিশেষ শক্তি হলো অল্প কথায় বিশাল ভাব প্রকাশ। ক্ষুদ্র পরিসরে জীবন ও জগতের গভীর দর্শনকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেন, তা পাঠকদের জন্য নতুন এক আস্বাদন তৈরি করে। তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত রূপক ও উপমাগুলো অনেক সময় চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য থেকে নেওয়া, আবার কখনো আধুনিক নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে উৎসারিত। পয়ষট্টি কবিতার সম্ভার’বিষাদের ঘোড়া’ তাঁর কাব্যিক দর্শনের সাক্ষ্য দেয়। বিষাদ তাঁর কবিতায় কেবল একটি অনুভূতি নয়। বরং তা এক ধরনের দার্শনিক উপলব্ধিতে রূপান্তরিত হয়।
রফিকুল ইসলাম আধার কেবল একজন স্থানীয় কবি নন, বরং তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তিনি শেরপুরের আঞ্চলিক সাহিত্যকে বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় যুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁর কবিতায় সাংবাদিকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং আইনজীবীর যুক্তিনির্ভর মেধা থাকলেও, মূল সুরটি একজন খাঁটি সংবেদনশীল মানুষের। তাঁর ভাষা সহজবোধ্য। কিন্তু ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ।
যেমন এ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘অটোফেজি’ পাঠে তা সহজেই অনুমেয়। এ কবিতায় কবি লিখেছেন,
‘বেঁচে থাকার জন্য
মৃত্যুকে শোষণ করাও এক শিল্প।’
এটা বলতে পারা একটা সাহসের ব্যাপার। আবার যখন তিনি ‘পরাহত স্বপ্ন’ কবিতায় বলে উঠেন,
‘কিন্তু আগামীর সবুজ প্রান্তরে
কেন বা নিষিদ্ধ হয়ে যায় দেখা? ‘
তখন একটু থেমে যেতে হয়। বুঝে নিতে হয় সময় ও তার অবগাহনকে।
অথবা ‘দুঃস্বপ্ন’ কবিতায় যখন বেজে উঠে,
‘কাঠের খাঁজে শুয়ে থাকে রাত,
বালিশহীন বিষণ্নতা
কানের কাছে ফিসফিস করে
এক পলাতকা করাত’।
তখন সত্যি হাসঁফাস করে ওঠে জীবন। দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই মেটাফোরের আড়শোলার মত চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে আর উঠতে না পারার মত। আবার উপমা-উৎপ্রেক্ষা অলংকরণের দিকে তাকালে পাই ,
‘কেমন গরম কালে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যায়, জুড়িয়ে যায় শরীর।’
জোছনার দুধস্নাত নিশ্বাস।
‘বেমানান’ কবিতায় শুনি,
‘সংগীত গলে পড়ে বিষাদের রক্তের মতো।
আলোও এখন সন্দেহজনক,
ছায়ারা হয়ে উঠেছে ঘাতক,
তারা আর সঙ্গ দেয় না
অভিনয়ের মুখোশ পড়ে
চলে যায় উড়ে, জাকানা পাখির মতো। /
বেঁচে থাকা এখন
শুধু একটা অভ্যেস-
যেমন জলর জমে নালায়
আর আমরা নাম দিই -‘জলাধার’।
তেমনি ‘দুঃস্বপ্ন’ কবিতায় শুনি,
‘জীবনকেও দেখা যায় যেন কাছ থেকে খুব।
পায়ের তালুতে সড়কের দীর্ঘ জীবন।’
‘পাঠ করি জীবন্ত বই’কবিতায় কবির উচ্চারণ,
‘তাই আমি বই কিনি না এখন,
নিজেকেই পড়ি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়,
নিজের ভেতর খুঁজে পাই
সবচেয়ে জীবন্ত বই’।
আর ‘অসময়ের সিনেমা’ কবিতায় বেজে ওঠে,
‘সময় এখন
জোছনার কব্জিতে তালা লাগায়,
সূর্যকেও শেখায়
কীভাবে চোখ বেঁধে রাখতে হয়।’
‘অন্ধকার’ কবিতায় শুনা যায়,
‘হঠাৎ সন্ধ্যার অন্ধকারে
আঁতকে ওঠে ছাতিমের ছায়া,
খাঁচায় জমা দীর্ঘশ্বাসে
কাঁপে বুকের গভীর আলো।’

তাঁর কবিতায় প্রেমেও কেমন যেন মধুর বিষাদ নেমে আসে। মনে হয় বিষাদই প্রেম। তাইবুঝি ‘লাল পাহাড়ের মেয়ে’ কবিতায় কবির আক্ষেপের সুর,
‘তবু তুমি হলে না ধানী মেয়ে,
ওড়ে গেলে শুধু,
খড়বিচালির উষ্ণ বিছানা
ফাঁকা রেখেই।’
নদী ও নারী কবিতায় শুনি,
‘নারী ও নদী দু’জনেই
চোখের পলকে বদলে ফেলে প্রবাহ’।
এ গ্রন্থের কবিতায় অনুসঙ্গের বৈচিত্র্যও নজরে পড়ার মত। যখন তিনি ‘দূষণ’ কবিতায় লিখেন,
‘ইউক্লিপটাসের দূষণ যেন মনের বিষ।’
শামসুর রাহমানকে কবি যে শ্রেষ্ঠ বলেই মানেন, মনে করেন বাক বদলে তার অবদান অনস্বীকার্য; সেটাও তার কবিতাতেই পাওয়া যায়। কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমানকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা ’কবিতার মিনার’ এ লিখেছেন,
‘বাংলা কবিতার ভেতর তুমি নির্মাণ করেছিলে
উঁচু মাথার আধুনিক মিনার-
নিজের অজান্তেই
তুমি বনে গিয়েছিলে বাকবদলের ইতিহাস,
এক দীর্ঘস্থায়ী সুখপাঠ্যের মহাকাব্য।’
তারপরও কবিতায় রহস্য ছাড়েনি। শব্দের ‘সীমান্ত নিনাদ’ কবিতায় শুনি,
‘বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে
পাশ দিয়ে চলে যায় একটি রহস্য ‘।
তবু কবিতা লেখা চলে। তিনি লিখে চলেন আপন মনে। হয়ত কবিতা জিনিসটাই এমন। কারও ধার ধারে না। অথবা ধার না ধারাটাই কবিতা । যেমন ‘অমানুষের ডায়েরি’ কবিতায় শুনা যায়,
‘বালুর শহরে,
আপসোসের গিলে-ফেলা ঘরবাড়ি পেরিয়ে
হেঁটে চলে এক সমুদ্র কাছিম’।
তাই হয়ত জিতে যায় কবিতা। একদম গোপনে। কাউকে কিছু না জানিয়েই বেরিয়ে পড়ে একাকী একটি সাইকেল। কেউ হয়ত বুঝতে পারে না। আবার বুঝতে পারে হয়ত কেউ কেউ।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।




