কাব্যগ্রন্থ : নীলকণ্ঠের গান
কবি : রফিকুল ইসলাম আধার
প্রকাশক : ফজলুর রহমান বকুল, নবসাহিত্য প্রকাশনী।

গত ২৭ মার্চ শেরপুর প্রেসক্লাবে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হলো কবি, গীতিকার, সাংবাদিক ও আইনজীবী রফিকুল ইসলাম আধার-এর ‘নীলকণ্ঠের গান’ এবং ‘বিষাদের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থদ্বয়ের মোড়ক উন্মোচন। দু’টি কাব্যগ্রন্থ একসাথে হাতে পেলেও সময়ের অভাবে ১৪/১৫ দিনে একটির বেশি পড়ে শেষ করতে পারিনি। সদ্য পাঠ সমাপ্ত করা কাব্যগ্রন্থটি হলো ‘নীলকণ্ঠের গান’।
দু’টি কাব্যগ্রন্থ থেকে নীলকণ্ঠের গান’কেই প্রথমে বেছে নেওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে গ্রন্থটির নাম। নাম দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কবি কেন এমন একটি বেদনার্ত নামকরণ করলেন সেই রহস্য উদঘাটন করার। কবি রফিকুল ইসলাম আধার ‘নীলকন্ঠের গান’-এ পুরানিক চরিত্র শিব যেমন জগত রক্ষার্থে সমুদ্র-মন্থনের সমস্ত বিষ নিজের কণ্ঠে একাই ধারণ করে নীল হয়ে গিয়েছিল, তেমন হলেন, নাকি পাঠককে ‘নীলকন্ঠ’ পাখির গান শুনিয়েছেন, সেই হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেছি।
বইটির প্রথম কবিতা ‘গোধূলির গল্প’তে কবি যখন বলেন,
‘মহারশির বিদীর্ণ তীর ধরে খুঁজি;
না পেয়ে অবুঝ মনে মেঘের ভেতরে খুঁজি,
যেন আমি এক দিকভ্রান্ত আকাশ হৃদয়।’
আমরা বুঝতে পারি, কবি তাঁর আরাধ্যকে খুঁজতে খুঁজতে বড় ক্লান্ত। কবির এই ক্লান্তি শুধু তার ব্যক্তিগত না-পাওয়ার বেদনার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা প্রেমিক-মনের চিরকালীন হাহাকার।
ওয়াকিং পাম কবিতায়,
‘তারপর,
এক ধূসর বিকেলে
আমার ভেতরের ‘বোধিবৃক্ষ’
তার শিকড় খুঁজে পায় না জল,
শুধু প্রেমহীন বালিমাটি বুকে শুকিয়ে থাকে।’
এখানেও খুঁজে না পাওয়ার হাহাকার তীব্র।
অথবা, মরণ খোয়াব কবিতায়,
‘নির্মল ভোর, কখনো তোমার মতো_
শিশিরভেজা দুর্বাঘাসে ঝিলিকের অহম।
হয়তো আমার আশার থেকে একটু বেশিই,
একটি নিঃশব্দ ঘোষণার মতো।’
মানব মনে গুমরে উঠা আকুতি কবির কবিতায় জীবন ফিরে পায়।

কবি রফিকুল ইসলাম আধার বেশ কিছু কবিতায় Dramatic monologue এর ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আমরা এখানে তুলে ধরতে পারি :
‘নারী তুমি দুঃখ বোঝা?’ কবিতায়,
‘নারী, তুমি কি দুঃখের মানে বোঝো?’
‘নারী, তুমি কি প্রণয় খুঁজে যাও আরো?
দুখের ছায়ায় সত্য খুঁজতে কি পারো?’
‘বিদ্বেষী চয়নিকার প্রতি’ কবির সহজ-সাবলীল অভিযোগ এবং সকাতর প্রশ্ন,
‘তুমি এতটা বিদ্বেষী হবে,
ভাবিনি কখনো।
নারীর এমন একঘরে হয়ে থাকার চেয়ে
পুরুষের বাহুডোরে বন্দী হওয়াই কি ছিলো না সহজ?
নাকি বিদ্রোহই তোমার একমাত্র পরিচয়?’
‘কেউ না জানুক’ কবিতায়
‘যদি প্রেমের স্মৃতি
তোমার অভ্যাসের নিরবতায় বিলীন হয়,
তবে,কেন টেনেছিলে কাছে,
কেন ঘামের ফোঁটা দিয়ে আঁকালে আলিঙ্গনের রেখা?’
‘ব্যতিক্রম’ কবিতাটি সত্যিই Dramaticism এর এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
‘বরং মিথ্যে নয়, ধরে নাও এ বাস্তব,
কখনো উল্টো সত্যকেই খেতে হয় বিষ,
মিথ্যাকে দিতে হয় নিরাপদ স্থান,……..!’
‘নীলকণ্ঠের গান’ কাব্যে কবি নারীর প্রতি নরের প্রেম এবং মানুষের প্রতি মানুষের প্রেমের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ‘প্রত্যাশার মেঘ চাই’ কবিতায় কবি ভূমিহীন-অভাবী মানুষের পক্ষে তাঁর কলমকে শাণিত করেছেন,
‘ভূমিহীন মানুষ খুঁজে দাঁড়াবার ভিত,
মাথাটা গোঁজার ঠাঁই,
অভাবী মানুষ ভাবে, অন্ন-বস্ত্র চাই_
কোথায় কীভাবে পাই?’
*********************
‘‘ভূমিদস্যুরা করেছে গ্রাস মানববসতি _
আশার সারথি হয়ে কুহকী-কৌশলে
রাতারাতি গৃহহীন। অরণ্যে দাপায়;
‘চাই, আরো চাই’– লোভের অনলে।’’
‘নীল কণ্ঠের গান’ এ বেশ ক’টি কবিতা metaphoric পংক্তিতে সমৃদ্ধ।
‘আমি-
সময়ের এক ভেজা কাক।’
‘তুমি কোন অস্থির জন্মের অনিবার্যতা,
বার বার কামড়ে গেলে ভেতরের নির্যাস!’
কবি অত্যন্ত সার্থকভাবে উপমান-উপমেয় আর উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ ঘটিয়ে তাঁর কবিতাগুলোকে সুখপাঠ্য করে তুলেছেন। প্রতিটা কবিতা পাঠককে ভিন্ন ভিন্ন রস আস্বাদনের সুযোগ দিবে।
বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ এবং এবং ঝকঝকে ছাপা আরেকটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। তবে, প্রুফ রিডিং এ আরেকটু বেশি সতর্কতা প্রয়োজন ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।
আমি ‘নীলকন্ঠের গা ‘ কাব্যগ্রন্থটির ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা এবং কবি রফিকুল ইসলাম আধারের সফল কাব্যিক-জীবন কামনা করি।
পরিশেষে, সুধী পাঠকমহলকে কাব্যগ্রন্থটির নাম-কবিতা ‘নীলকন্ঠের গান’ কবিতার প্রথম স্তবকে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সকাতর অনুরোধ করছি।
‘যদি ভুলে যাবে মরা নদী
কেন বালুচরে বুনেছিলে আশ্বিনের বীজ-রোদ্দুর,
কেন স্বমহিমায় দু’হাতে কেটেছ ঘনকালো মেঘ
নাগালের থেকে বহুদূর?’
লেখক : কবি, ছড়াকার ও শিক্ষক, শেরপুর।




