সোহাগপুর গণহত্যা দিবস আজ

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের সময় সোহাগপুর গণহত্যায় প্রথম নিহত হন রমেন্দ্র রিছিল। তখন তার স্ত্রী ঝর্ণা দিও (৭২) পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। একই গ্রামে নির্যাতিতরা স্বীকৃতি পেলেও, স্বীকৃতি মেলেনি ঝর্ণা দিও ও তার স্বামী রমেন্দ্র রিছিলের। সেই স্বীকৃতির আশায় স্বামী হারানো বিধবা ঝর্ণা দিও এখন বার্ধক্যজনিত রোগে জর্জরিত হয়ে মানবেতন জীবন যাপন করছেন। টাকার অভাবে পরিবার তার চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারছেন না। মৃত্যুর আগে স্বামী ও নিজের স্বীকৃতি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ঝর্ণা দিও।
সম্প্রতি ঝর্ণা দিওয়ের বাড়িতে গেলে কথা হয় তার মেয়ে লিন্ডা দিওয়ের সাথে। তিনি জানান, তার মা জরায়ু ক্যান্সারে ভুগছেন।এছাড়া বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এসময় ঝণা দিও বাড়ির উঠানে লাঠি হাতে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন। তার ২টি পা ফুলে আছে। অর্থের অভাবে ঠিকমত তাঁর মায়ের চিকিৎসাসহ খাবার-দাবারও দিতে পারছেন না। তখন ঝর্ণা দিও হাত নেড়ে বলেন,কেও আমগার খোঁজ নেয় না।

লিন্ডা বলেন,প্রতিদিন মাংসসহ ভালো ভালো খাবার খেতে চান তাঁর মা। কিন্ত টাকার অভাবে তা তিনি দিতে পারেন না। সেবাশুশ্রুতার জন্য তিনি নিজেই চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে মায়ের পাশে আছেন।
হতাশা নিয়ে তিনি আরোও বলেন,সোহাগপুর গণহত্যায় সর্ব প্রথম পাকসেনারা আমার বাবাকে মায়ের সামনে নির্বিচারে হত্যা করেন। মাকে শারীরিক ভাবে নিয়ার্তণ করেন। সরকারিভাবে সেই দিনের নিহতদের শহীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেই শহীদদের নামফলকসহ তৈরী করা হয়েছে ‘বীর জায়া স্নৃতিসৌধ’। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেখানে আমার বাবার নাম নেই। এছাড়াও সেইদিন নির্যাতনের শিকার ১৪ নারীকে নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্ত এখনও আমার মা সেই স্বীকৃতি পেলেন না।
ঝর্ণার পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও দেশিয় রাজাকার সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যায় ১৮৭ জন নিরিহ মানুষকে হত্যা করে। এতে সর্বপ্রথম ওই গ্রামের রমেন্দ্র রিছিলকে মেরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করা হয়। এসময় ৬২জন নারী বিধবা হন।
পরে এলাকার সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় প্রত্যেক নারীকে প্রতিমাসে ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে দুই হাজার, বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাক থেকে ৪০০ ও সরকারি বিধবা ভাতা হিসেবে ৫০০ টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করেন।সেই বিধবাদের মধ্যে বর্তমানে বেঁচে আছেন ২৩জন নারী। তাঁর মধ্যে নির্যাতনের শিকার ১৪ জন নারীকে নারী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রানালয়ের ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন প্রকল্প’ মাধ্যমে সোহাগপুর গ্রামের গণহত্যায় স্বামী- স্বজন হারানো ও নির্যাতনের শিকার ৩০ নারীর জন্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সোহাগপুর বিধবাপল্লিতে ১০ শতক জমি কিনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দিয়েছে। তার পাশে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ৬ শতক জমি কিনে অবিনশ্বর করে দিয়ে সেই দিনের শহীদদের নামের তালিকা করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্ত নিহতদের তালিকা তৈরীর সময় ঝর্ণা দিও তাঁর মেয়ের সাথে রাজধানীতে বসবাস করায় তার স্বামী রমেন্দ্র রিছিলের কথা কেও মনে রাখেনি। তাই সেই ফলকে তাঁর কোন নামও নেই। নির্যাতনের শিকার হয়েও পাননি সরকারিভাবে কোন সুযোগ সুবিধা। অবশেষে ২০২১ সালে ঝর্ণা দিও তার স্বামীর শহীদের ও নির্যাতনের স্বীকৃতি দাবী জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রাণালয়ের আবেদন করেছেন।
এ ব্যাপারে স্থানীয় বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান বলেন,সোহাগপুর গণহত্যায় ১৮৭জনের মধ্যে সর্বপ্রথম রমেন্দ্র রিছিলকে হত্যা করা হয়। এসময় তাঁর স্ত্রী ঝর্ণা দিও নির্যাতনের শিকার হন। কিন্ত যখন সরকারীভাবে স্বীকৃতি প্রক্রিয়া চলছিল তখন ঝর্ণা দিও এলাকায় ছিলেন না। তিনি মন্ত্রণালয়ে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন। ঝর্ণা দিও দারুণ ভাবে অসুস্থ্য যদি স্বীকৃতিটা পান তাহলে মরেও শান্তি পাবেন বলে আমি মনে করি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) খৃষ্টফার হিমেল রিছিল বলেন, আমাদের কাছে ইতোমধ্যে যে তালিকা আছে তার মধ্যে ১৪ জন বীরাঙ্গনা গেজেটভুক্ত হয়েছেন৷ তাঁরা সরকারি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়াও ঝর্ণা দিওসহ বাকী যারা আছেন তাদের নাম গেজেটভুক্তির জন্য আবেদন এসেছিলো। ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি তদন্ত করে সুপারিশসহ আমাদের কাছে জমা দিয়েছিলো। আমরা সেই সুপারিশটি মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে প্রেরণ করেছি। আর রমেন্দ্র রিছিলের নামও শহীদদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




