ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও অর্থাভাবে ভর্তি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের সন্তান মো. ফোরকান আলী (১৮)। তিনি এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধাতালিকায় ১৪৯ তম স্থান অর্জন করেছেন। এ ফলাফলে ফোরকান ও তার পরিবারসহ এলাকার লোকজন খুশি হলেও এখন ভর্তি, বই ক্রয় ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগানোর সাধ্য নেই তাদের। ফলে সুযোগ পেলেও ভর্তি নিয়ে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন ফোরকান ও তার পরিবার।

জানা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলার জগৎপুর এলাকার দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা জমশেদ আলী মন্ডলের ঘরে জন্ম নিলেও অভাবের সংসারে একসময় ফোরকানের বাবা মো. আলতাব আলী বিয়ের পর শ্রীবরদী উপজেলার খরিয়াকাজীরচর ইউনিয়নের উত্তর খরিয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেইসাথে তিনি বসতভিটা ছাড়া কোন জায়গা-জমি না থাকায় দিনমজুরি এবং কিছু জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। ৩ ভাইবোনের মধ্যে ফোরকান সবার ছোট হলেও প্রাথমিক শিক্ষা জীবন থেকেই সে মেধাবী। কিন্তু অর্থসংকটে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি তার। ফলে ২০১৫ সালে উত্তর খরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিইসি, ২০১৮ সালে খরিয়াকাজীরচর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি এবং ২০২১ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে শেরপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে ওই কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হন এবং শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। এরপর থেকেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন।
তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং ২৮ মার্চ তার ফলাফল আসে। কেবল তাই নয়, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ ইউনিটের দ্বিতীয় শিফটে মেধাক্রম ৮৪৫তম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে মেধাক্রম ৩৮৯১ তম হয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই ইচ্ছা তার। কিন্তু ভর্তি, বই ক্রয় ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ তার ন্যূনতম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন হলেও দরিদ্র বাবার পক্ষে তার যোগান দেওয়া মোটেই সম্ভব নয়।

মো. ফোরকান আলী জানান, বাবার অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ যোগাতে মাঝে-মধ্যে আমিও ক্ষেত-খামারে দিনমজুরের কাজ করেছি। মা-বাবার সহযোগিতা আর দোয়ায় কষ্টের সংসারেও এ পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করব। এখন সেই সুযোগ সৃষ্টি হলেও আর্থিক সংকটে রয়েছি দুঃশ্চিন্তায়। তবে পড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারে চাকরি করতে চান তিনি।
ফোরকানের বাবা আলতাব আলী বলেন, আমি খুব অসহায় মানুষ। কিছু জমি বর্গা চাষ করে কোনমতে চলি। এই বসতভিটাটুকু ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। আমার ছেলের পড়াশোনার খরচ যোগানো খুবই কষ্টকর ছিল। এজন্য সে ইটভাটায় কাজ করেও নিজের খরচ চালিয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। এখন আমি যে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করব সেই অবস্থাটুকু আমার নাই। তাই আমি সবার সহযোগিতা চাই যাতে আমার ছেলেটার স্বপ্ন পূরণ হয়।
খরিয়াকাজীরচর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হাসান বিন জামান বলেন, ফোরকানদের অভাবের সংসারে খাওয়া-পড়ার খরচ যোগাড় করাই কঠিন। তারপরও নিজের আগ্রহের কারণে ফোরকান ধাপে ধাপে এগিয়ে আজ দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এটা আমাদের স্কুলের জন্যও গর্বের। কিন্তু এখন সেখানে ভর্তি করার মতো আর্থিক অবস্থাও ফোরকানের পরিবারের নেই। তারা দিন আনে, দিন খায়। তাই ফোরকানের স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল খায়রুম জানান, হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সরকার নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে। কেবল আর্থিক সঙ্কটের কারণে মেধাবীরা এখন ছিটকে পড়ে না। জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ঢাবিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া ফোরকানকে সহায়তা করা হবে।




