শেরপুরের শ্রীবরদীর পল্লীতে পারিবারিক কলহের জের ধরে বোরখা পড়ে কুপিয়ে স্ত্রী, শ^াশুড়ি ও জ্যাঠাশ^শুরকে হত্যাসহ শ^শুর-শ্যালক ও জেঠিশ^াশুড়িকে রক্তাক্ত করার ৫ দিন পরও এলাকায় কাটেনি শোকের ছায়া। হতাহতদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনসহ খোদ এলাকাবাসীই যেন শোকে বিহ্বল। তবে একদিকে তাদের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ, অন্যদিকে তারা ওই নৃশংস ঘটনায় ঘাতক মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টুর দ্রুত ফাঁসির দাবি তুলেছেন। কেবল তাই নয়, ফাঁসির দাবিতে মুখ খুলেছেন মিন্টুর ২ সন্তান মো. মনিরুজ্জামান (১৬) ও মারিয়া আক্তার মিমও (১০)। ২৭ জুন সোমবার সরেজমিনে শ্রীবরদীর উপজেলার কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের অকুতোস্থল পটল গ্রামে গেলে শ্যামলবাংলা২৪ডটকমের অনুসন্ধানে পাওয়া যায় ওই তথ্য। অন্যদিকে ওই চাঞ্চল্যকর মামলায় এখনও গ্রেফতার হয়নি মিন্টুর সহযোগী অপর ৩ আসামি। পুলিশ বলছে, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

মিন্টু পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী মনিরা বেগমসহ একই পরিবারের ৬ জনকে কুপিয়ে হতাহত করার ঘটনাস্থল পটল গ্রামের সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে পাথর হয়ে আছে ওই বাড়ির লোকজন। গত ৪ দিন যাবত চুলা জ্বলেনি বাড়িতে। নাওয়া–-খাওয়া নেই বাড়ির লোকজনের। ৩জন সুস্থ মানুষ মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে নির্মমভাবে প্রাণ হারাবে এখনও কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। মা-নানী ও নানার বড় ভাইকে হারিয়ে মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে মিন্টুর ছেলেমেয়ে মনিরুজ্জামান মনির ও মারিয়া আক্তার মিমের। বাবা মিন্টুকে নিয়ে প্রশ্ন করতেই মনির চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘খুব খারাপ লোক। আমারে কুন দিন ভালোবাসে নাই। মারে খুব অত্যাচার করতো। রমজান মাসে পাট শাক গরু খায়া ফেলে। তহন কাঁচি দিয়া মারে জবাই করতে যায় বাবা। তারপরে ভয়ে মা আমগরে নিয়া নানার বাড়িতে চইলা আসে। পরে আব্বা নানা বাড়িতে আইসা কয়, আমার আম্মা নাকি ৫ লাখ টাকা নিয়া আইছে।’ সে বলে, ‘যেভাবে আব্বা মায়েরে মারছে, কুন জানোয়ার এমনভাবে কাউরে মারে না’। ওই ঘটনায় সে পিতার ফাঁসি দাবি করে বলে, ‘তারে ফাঁসি দিলেও কম শাস্তি হইবো।’ মেয়ে মিম বলে, ‘ওর (বাবার) চেহারা দেখলে আমার ভয় লাগে। ঘিন্না করে। ও আমার মা- নানী- নানারে মারছে। আমি কাছে থাকলে আামারেও মারতো। তার ফাঁসি হওয়া উচিত।’
একইভাবে বড় বোন মনিরা, মা শেফালী ও জ্যাঠা নূর মোহাম্মদ ওরফে মাহমুদ হাজীর ভয়ঙ্কর মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছে মামলার বাদী মিনারাকে। তিনি বলেন, ‘জ্যাঠা মাহমুদের ঘর পর্যন্ত গেলে সেখানে মিন্টু আমার বোনটাকে গরু-ছাগল যেভাবে কাটে সেভাবে কোপাতে কোপাতে মেরে ফেলে। চিৎকার শুনে জ্যাঠা ঘর থেকে বের হয়ে আসলে এক কোপে তারেও মেরে ফেলে।’ আর বাবার মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না নিহত মাহমুদ হাজীর ছেলে গাজীপুরে একটি গার্মেন্টসে কারখানায় চাকরিরত জিসান (৪০)। তিনি বলেন. ‘এক বাড়িতে ৩টা মার্ডার। কোনো কারণ ছাড়া। আমগর চোখের পানি শুকায়া গেছে। কাঁদবার পারি না। আব্বা খুব ভালো মানুষ ছিল। আব্বা কুন সাতে-পাঁচে ছিল না। বোন মনিরাকে বাঁচাতে গেলে তাকেও মেরে ফেলে মিন্টু। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’ একই দাবি করেন স্থানীয় সমাজপতি আব্দুর রহিম, কৃষক হযরত আলী ও ব্যবসায়ী নূর ইসলামসহ অনেকেই।

এ ব্যাপারে শ্রীবরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, ‘আসামি মিন্টু আদালতে ১৬৪ ধারায় প্রদানকৃত জবানবন্দিতে বোরখা পরে কুপিয়ে ৩ জনকে হত্যা ও একই পরিবারের আরও ৩ জনকে রক্তাক্ত করার দায় স্বীকার করেছে। মামলার তদন্তেও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ডিজিষ্টদের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ভিকটিমদের মেডিকেল রিপোর্ট পেলে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারব’। ঘাতক মিন্টুর ফাঁসির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশা করছি এ মামলায় উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।’
উল্লেখ্য, গত ২৩ জুন শ্রীবরদী উপজেলার কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের পটল গ্রামে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দা কুপিয়ে স্ত্রী মনিরা বেগম (৩৫), শাশুড়ি শেফালী বেগম (৫০), চাচা শ্বশুর নূর মোহাম্মদকে (৬০) হত্যা করে। ওইসময় গুরুতর আহত হন মিন্টুর শ্বশুর মনু মিয়া, তার ছেলে শাহাদত হোসেন ও নিহত মাহমুদের স্ত্রী ফুল ছাহারা (৫২)। গুরুতর আহত মনু মিয়া এখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিন্টুকে প্রধান আসামি করে মোট ৪ জনের বিরুদ্ধে শ্রীবরদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন মনু মিয়ার মেয়ে মিনারা বেগম। পরে পুলিশ মিন্টুকে গ্রেফতার করে।




