সরকারের ‘সাস্টেনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুডস প্রজেক্ট’ (সুফল) বা টেকসই বন ও জীবিকা প্রকল্পের আওতায় শেরপুরে দেশীয় বৃক্ষ, ফল ও ওষুধিসহ ৬০ প্রজাতির ২৫ লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সীমান্তবর্তী ৩ উপজেলার গারো পাহাড় ঘেরা বনাঞ্চলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা ও অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ওইসব বৃক্ষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তেমনি বন থেকে প্রাপ্ত ফলমূলে এলাকার মানুষের খাদ্য চাহিদাও পূরণ হবে।


জেলা বন বিভাগ, ইএসডিও সূত্র জানায়, পর্যটকদের আনন্দ দেয়া এবং বন নিয়ে গবেষণা করছে এমন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আরো সমৃদ্ধ করবে এ প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৮ সালের ১ জুলাই ‘সুফল’ কাজ শুরু করে। আর মাঠ পর্যায়ে বন বিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। দেশের আট বিভাগের ২৮ জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬০০ গ্রাম এতে সম্পৃক্ত।
প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- নতুন করে ৭৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বনায়ন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচল পথের (করিডোর) উন্নয়ন, বিপন্ন বন্যপ্রাণী (হাতি, শকুন, ঘড়িয়াল, ডলফিন ও বাঘ) সংরক্ষণ, বিপন্ন প্রজাতির গাছপালার লাল তালিকাকরণ, কিছু স্থাপনা নির্মাণ, বনাঞ্চলের আশাপাশের বন নির্ভর ৬০০ গ্রামের ৪০ হাজার পরিবারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম তিন অর্থবছরে প্রায় এক হাজার ১৫৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ৩৩.০ মিলিয়ন টন কার্বন বন বাগান গ্রহণ করবে। যা দেশের জন্য একটি মাইলফলক। এরই ধারাবাহিকতায় শেরপুরের বনাঞ্চলেও শুরু হয় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। এরই মধ্যে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী সীমান্তের ৩ হাজার একর বনভূমিতে দেশিয় বৃক্ষ, ফল ও ওষুধিসহ ষাট প্রজাতির ২৫ লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। রোপণকৃত দেশিয় বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে নিম, অর্জুন, বেল, তেঁতুল, জাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, জলপাই, আমলকি, হরিতকি, বহেড়া, শিমুল, কদম, উলট, কম্বলঢেউয়া, চালতা, বাসক, তুলসী, পিপুল, শতমুলী, অশ্বগন্ধা, সর্পগন্ধা, ছাতিম, কালমেঘ, হিজল, মহুয়া, নাগেশ্বর, পিতরাজ, কাঞ্চন, গোলাপজাম, ডুমুর, উলটচন্ডাল, জারুল, শাল, গজারি ইত্যাদি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওইসব বন বাগানে প্রায় নয় শতাধিক শ্রমিক চরা রোপণ, পানি দেয়া ও আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছে। অন্যদিকে, ওই প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ে বসবাসকারী অতিদরিদ্রদের জীবন মান উন্নয়নে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ঠাকুরগাঁওয়ের ইকো সোসাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) নামে একটি এনজিও ।
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘সুফল’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সংস্থান নিশ্চিত হবে। সেই সঙ্গে গারো পাহাড়ে বসবাসকারীদের জীবনমান আরো উন্নত হবে। জেলার ১৯ হাজার একর এলাকা জুড়ে রয়েছে বিশাল বনাঞ্চল। কামালপুর থেকে শুরু করে নাকুগাঁও বর্ডার পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার দৈর্ঘের প্রাকৃতিক বন বাগানের শাল, গজারি, দেশিয় ফলসহ ওষুধি গাছপালা নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক আগেই। বিলুপ্ত হয়েছে নানা জাতের বন্যপ্রাণী। তাই খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে এসে মাঝে মধ্যেই বন্যহাতি দলবেঁধে হামলা চালায় ফসলি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। প্রতিহত করতে গেলে শুরু হয় হাতি-মানুষের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে কখনও মানুষ আবার কখনও হাতিও মারা পড়ে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতা আলতাফ হোসেন বলেন, গারো পাহাড়ে আগের সেই দেশিয় গাছ আর নেই। ওই জায়গাটি দখল করেছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিদেশি জাতের ইউকেলিপটাস এবং উডলট বৃক্ষ। এর ফলে জীব বৈচিত্র নষ্ট হয়ে গেছে। সমানতালে বেড়েছে মাটির ক্ষয়। বিদেশি জাতের গাছগুলো অতিরিক্ত পানি শোষণ করে বলে ধ্বংস হয়েছে পাহাড়ি ঝর্ণা। তিনি মনে করেন, সরকারের ‘সুফল’ প্রকল্প বাস্তবায় হলে শেরপুরের বনাঞ্চল ফিরে পাবে তার অতীত ঐতিহ্য। নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হবে গারো পাহাড়ে।

বালিজুড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, সুফল প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া। পাহাড়ের পতিত জমিতেও রোপণ করা হচ্ছে দেশিয় প্রজাতির নানা বৃক্ষ। এরই মধ্যে অনেক গাছে ফল এসেছে তাই নতুন নতুন পাখ পাখালির আনাগোনাও বেড়েছে। ধীরে ধীরে প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সৌন্দর্য। বরাদ্দ অনুযায়ী প্রকল্পটি জেলায় শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ইএসডিও’র ময়মনসিংহ বিভাগীয় ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর মুক্তার হোসেন বলেন, পাহাড়ে বনের ওপর নির্ভর করে যেসব অতিদরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহ করতে হয় মূলত তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অনেকেই বনের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করছেন। এ থেকে বিরত রাখার জন্য সরকার তাদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করে দেবে। তিনি আরও বলেন, এ জন্য প্রকল্পে ৩টি ব্যাংক হিসাব থাকবে। এর মধ্যে এলডিএফ ফান্ড থেকে প্রত্যেক প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী ৪০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। এটি সরকারের একটি অন্যতম মহৎ উদ্যোগ বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বন বিভাগের সদস্যদের সমন্বয়ে ৯ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটির অধীনে আরও ২টি উপ-কমিটি থাকবে। ওই কমিটিগুলো নির্ধারণ করবে সুফল প্রকল্পে উপকারভোগী কারা হবে। পরে বাছাই পর্ব শেষে অতিদরিদ্রদের পছন্দ অনুযায়ী নানা বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে সরকার তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেবেন।
জেলা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ড. প্রাণতোষ রায় বলেন, পর্যটকদের আনন্দ দেয়া এবং বন নিয়ে গবেষণা করছে এমন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করবে এ প্রকল্প। পাহাড়ের পতিত জমিতেও রোপণ করা হচ্ছে দেশিয় প্রজাতির নানা বৃক্ষ। এরই মধ্যে অনেক গাছে ফল এসেছে তাই নতুন নতুন পাখ পাখালির আনাগোনাও বেড়েছে। ধীরে ধীরে প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সৌন্দর্য। বরাদ্দ অনুযায়ী প্রকল্পটি জেলায় শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে।




