শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরুনা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের আদিবাসি অধ্যুষিত চারটি গ্রাম বাবেলাকোনা, হারিয়াকোনা, কুমারগাছি ও চান্দাপাড়া। এখানে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এদের মধ্যে অর্ধেক গারো, হাজং, কোচ ও বর্মণ সম্প্রদায়ের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত বাবেলাকোনা-হারিয়াকোনা গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ী কর্ণঝোড়া নদী। এখানকার অধিবাসীরা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
গ্রামগুলোতে মসজিদ-মাদরাসার পাশাপাশি রয়েছে তিনটি গীর্জা, একটি মন্দির। রয়েছে বাবেলাকোনা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবেলাকোনা আদিবাসি বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। সীমান্ত সড়কের মেঘাদল শয়তান বাজার থেকে পাহাড়ী ওই চার গ্রামে ঢোকার প্রধান সড়কটি বিগত ৫০ বছরেও পাকাকরণ হয়নি। এটেল মাটি যুক্ত পাহাড়ী জনপদটি খানাখন্দে ভরা। ত্রিশ বছর আগে কর্ণঝোড়া নদীর উপর একটি সেতু নির্মিত হয়। সেতুর কাছে মেশিন বসিয়ে বালু তোলার ফলে সেটিও হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ওই সড়কে যাতায়াত করতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মানুষ। কয়েক কিলোমিটার মাথায় করে চাষীরা সব্জী নিয়ে আসছেন শয়তান বাজারে বিক্রি করতে। অনেকে ভ্যানে করে সব্জী আনলেও প্রতি কেজিতে ৫-৭ টাকা নিচ্ছে চালকরা। কারণ কর্দমাক্ত সড়কে ভ্যান চালানো ভীষণ কষ্ট।

এলাকার সব্জী চাষী মিঠুন সাংমা বলেন, প্রতিদিন শয়তান বাজারে লাখ লাখ টাকার সব্জী বিক্রি হয়। এসব সব্জী ঢাকায় যায়। প্রান্তিক কৃষকরা করলা, কাকরোল, বেগুন, বটবটি, কুমড়া জাতীয় সব্জী কখনো মাথায় করে আবার কখনো ভ্যানে করে অনেক খস্টে বাজারে নিয়ে আসে। সময় মত বাজারে না এলে দাম পাওয়া যায় না। ভ্যান খরচ দিতে অনেক টাকা লাগে। রাস্তার জন্য হামাদের খুব খষ্ট হয়।
হারিয়াকোনা গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও ট্রাইবাল চেয়ারম্যান প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, ৫০ বছর ধরে শুনছি ৪ কিলোমিটার সড়ক পাকা হবে। কিন্তু হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডি রশি টানাটানি করছে। এলজিডি বলে পানি বোর্ড নদীর কাজ না করলে রাস্তা করা যাবে না। আর পানিবোর্ড বলছে ইচ্ছে করলেই নদীর পাড় সংস্কার করে এলজিইডি রাস্তা করতে পারে। তাদের রশি টানাটানিতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। চার গ্রামের মানুষ দিনের বেলায় অনেক খষ্টে কাজকর্ম সেরে বাড়ীতে আসে। তারা রাতে বের হন না। কারণ এ সড়কে কোন যান চলাচল করে না। তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী নারী- শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়তে হয় এলাকার মানুষদের। কারণ তারা অসুস্থ হলে ওই সড়ক দিয়ে উপজেলা সদরে পৌছাতে হিমসিম খেতে হয়। চার কিলোমিটার সড়ক তো সড়ক নয়, যেন নরক।
সিংগাবরুনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকরুজ্জামান কালু বলেন, আমি এলাকার বাসিন্দা। এলাকার মানুষ প্রায় শতভাগ ভোট নৌকায় দেন। মানুষকে বলেছি, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে সড়কটি পাকা হবে। এলজিইডি, পানিবোর্ডসহ স্থানীয় ইউএনও সাহেবদের অনেক বলেছি। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেন না। এমপি সাহেব পানিবোর্ড ও এলজিইডিকে তাগাদা দিয়েছেন। রাস্তা হবে বলতে বলতে এক যুগ হয়ে গেলো। এখন এলাকার মানুষের কাছে মাথা তুলে কথা বলতে পারি না।
এলজিইডি’র শ্রীবরদী উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, আমি এবং ইউএনও মহোদয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসডিকে নিয়ে ওই স্থানে গিয়েছিলাম। তাঁকে আমরা বলেছি নদীর যে অবস্থা তাতে রাস্তা করলে দুই-এক বছরে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তাই আপনারা খনন করে পারেন, বাঁধ দিয়ে পারেন একটা কিছু করেন। তারপর আমরা রাস্তা করে দিব।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড শেরপুর-জামালপুর এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাইদ বলেন, যত্রতত্র বালু উঠানোর ফলে কর্ণঝোড়া নদীতে কিছুটা ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। তছাড়া ভাঙ্গন সব জায়গায় নেই। আমরা ইতোপূর্বে ওই সড়কে নদীতে বাঁধের কাজ করেছি। পাহাড়ী নদীতে উজান থেকে প্রতিবছর বালু আসে। ফলে নদী ততটা গভীর হয় না। তিনি বলেন, এলজিইডি অনেক সময় দায় এড়ানোর মত কথা বলে। যেহেতু সড়কে প্রচুর জায়গা আছে তারা নদীর পাড় একটু ছাড় দিয়ে ইচ্ছে করলেই রাস্তা করতে পারেন। যদি তখন রাস্তা ভাঙ্গনের কবলে পড়ে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। তারপরও আমি সরেজমিন করে বিষয়টি দেখবো।




