জাকির হোসেন, ছাতক (সুনামগঞ্জ) : ভুল অপারেশনে শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছাতকে বেসরকারি হাসপাতাল জাবা মেডিকেল সেন্টার ভাংচুর করেছে জনতা। ৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে শিশুর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা জাবা মেডিকেল সেন্টার ও হাসপাতালে লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে দফায়-দফায় হামলা চালায়। হামলায় আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধিন জাবা মেডিকেল সেন্টার ও হাসপাতালের দরজা, জানালা, থাই গ্লাস ভাংচুর করলে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। প্রায় দু’ঘন্টাব্যাপী দফায়-দফায় জনতার তান্ডবে শহরজুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সড়কের দু’পাশের দোকানপাট বন্ধ করে দেয় ব্যবসায়ীরা। আতংকিত শহরবাসী দিক-বেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে হিমশিম খায়। পরে পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী, কাউন্সিলর তাপস চৌধুরীসহ গন্যমান্য ব্যক্তি বর্গের হস্তক্ষেপে প্রায় দু’ঘন্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হন। জানা যায়, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের জামুরা গ্রামের মতিন্দ্র দাসের পুত্র ও জামুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেনীর মেধাবী ছাত্র মনোজিৎ দাস (১২) এপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হলে তাকে বুধবার সকালে পৌর শহরের জাবা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে ১২হাজার টাকার প্যাকেজ চুক্তিতে সন্ধ্যায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডাঃ সমিরন নাথ, সহকারি ডাঃ আব্দুলাহ আল-হেলাল ও ডাঃ (এনেসতেসিয়া) মইনুল ইসলাম ডালিম তার অপারেশন শুরু করেন। কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ছাড়াই অপারেশন শুরু করা হয়। অপারেশন শুরুর আধঘন্টা পর রোগীকে জরুরী ভিত্তিতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরনের কথা বলেন ডাঃ সমিরন নাথ। রোগীকে সিলেট নেয়ার সকল ব্যবস্থা যখন ঠিকঠাক তখন অপারেশন সফল হয়েছে বলে জানালেও তার ক্ষুদ্রান্তে বেশ কিছু অংশে পচন ধরার কারনে আরো একটি মেজর অপারেশনের প্রয়োজন বলে জানান ডাক্তার সমিরন নাথ। এ জন্য তাকে বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ডাক্তাররা তড়ি-গড়ি করে জাবা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। কিন্তু অপারেশনে আসা ডাক্তাররা হাসপাতাল ত্যাগ করার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মনোজিৎ দাস। এ বিষয়টি হাসপাতালের চেয়ারম্যান, ম্যানেজার, ষ্টাপ, নার্সরা জানলেও কৌশলে তা গোপন রাখা হয়। এদিকে রোগীর পিতা মতিন্দ্র দাস অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ডাক্তারের ভুল অপারেশনের পর-পরই তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। এরপর মনোজিৎ দাসকে ওটি রুমে রেখে তার মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে মনোজিৎ দাসকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরনের নামে কর্তৃপক্ষ মদিনা এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের একটি গাড়ীতে মৃত মনোজিৎকে তুলে দেয়। তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে অন্তত ৫-৬ঘন্টা আগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তব্যরত ডাক্তার জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত উত্তেজিত জনতা দফায়-দফায় জাবা মেডিকেল সেন্টার ও হাসপাতালে হামলা চালায়। অবস্থা বেগতিক দেখে কর্তৃপক্ষ-ষ্টাপসহ মেডিকেল সেন্টার তালাবদ্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হতে থাকলে থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করে। স্থানীয় লোকজন জানান, জাবা মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্নভাবে বিতর্কের সৃষ্টি করে আসছে। চিকিৎসা সেবার আড়ালে সোনা পাঁচার করতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের ভাই বাবুল মিয়া র্যাবের হাতে ধরা পড়েন মেডিকেল সেন্টারের একটি কক্ষে। মেডিকেল সেন্টারের সামনে সিলেট বিভাগের অভিজ্ঞ ডাক্তারদের নামে নেমপ্লেট সাজিয়ে রাখলেও এখানে ভুঁয়া ডিগ্রীধারী ডাক্তার দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাবার অভিযোগ রয়েছে। জাবা মেডিকেল সেন্টারের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলমও একজন বির্তকিত ব্যক্তি বলে তারা মন্তব্য করেন। জাবা নামধারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেক আগেই জাবা মেডিকেল সেন্টার বন্ধ হয়ে পড়ে। বন্ধ থাকা মেডিকেল সেন্টারের অভ্যন্তরে অসামাজিক কার্যকলাপও পরিচালিত হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। এদিকে মৃত মনোজিৎ দাসের ময়না তদন্ত শেষে তার গ্রামের বাড়িতে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মনোজিৎ দাসের আত্মীয় মৃত শশী মোহন দাসের পুত্র শিবু দাস বাদী হয়ে জাবা মেডিকেল সেন্টারের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (সার্জারি) ডাঃ সমিরন নাথ, ডাঃ আব্দুলাহ আল-হেলাল, এনেসতেসিয়া ডাঃ মইনুল ইসলাম ডালিমকে আসামী করে বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাতক থানায় একটি হত্যা মামলা (নং-৩) দায়ের করেছেন। এ ব্যাপারে আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার হাসপাতালে এ’টি ছিল প্রথম অপারেশন। সার্জারি বিভাগের অভিজ্ঞ ডাক্তারও তিনি অপারেশনের জন্য এনেছিলেন। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্রও ছিল মওজুদ। কিন্তু কিভাবে এ ঘটনা ঘটলো তিনি কিছুই জানেন না। এদিকে অপারেশনের নামে মনোজিৎ দাসের কিডনী চুরি করা হয়েছে বলে শহরে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইছে। ছাতক থানার অফিসার্স ইনচার্জ শাহজালাল মুন্সি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। ইতিমধ্যেই মামলা এফআইআর করা হয়েছে।




