ads

বৃহস্পতিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

রফিকুল ইসলাম আধার-এর ছোটগল্প ‘তুরিনের ফেরা’

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক - ফটো কার্ড
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ ৮:২৪ অপরাহ্ণ

পড়ন্ত বিকেলের বিষাদ ছায়া তখন ছড়িয়ে পড়েছে পৈত্রিক দীঘির শানবাঁধানো ঘাটে। এই নির্জনতা এখন আর নিছক সময় কাটানো নয়, কবি ও গবেষক ইমরান হাসানের জীবনের এক অনিচ্ছাকৃত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পেশায় তিনি স্থানীয় ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কিন্তু গত এক দশক ধরে তাঁর ভেতরের আলোটা যেন ধীরগতিতে নিভে আসছে। বৈরাগ্যের একটা ভারী চাদর তিনি জড়িয়ে নিয়েছেন নিজের চারপাশে। কলেজ থেকে ফিরে প্রায় প্রতিদিনই তিনি দীঘির ঘাটে একটি কাঠের চেয়ার ও ছোট্ট টেবিল নিয়ে বসেন। নির্জন রাতের আঁধারেও মাঝেমধ্যে এসে বসে থাকেন পাখির করুণ কলতানে কান পেতে।

Shamol Bangla Ads

তবে আজ বাতাসটা অন্যদিনের মতো নয়। আজ টেবিলে খোলা বই পড়ে আছে, হাতে কলম-কিন্তু ইমরান না পারছেন কিছু পড়তে, না লিখতে। চারপাশের বিষণ্ণ নিরবতা ফুঁড়ে হারানো অতীত এসে তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে কোনো এক অদৃশ্য অক্টোপাসের মতো। স্মৃতিতাড়িত বুকের ভেতরটায় এক ফোঁটা স্বস্তি নেই; যেন বহু পুরোনো এক দীর্ঘশ্বাস এসে জমেছে গলা পর্যন্ত।

মনে পড়ছে ঠিক ১০ বছর আগের সেই বেদনাময় দিনগুলোর কথা। ইমরান আর তুরিন- মুনমুন রহমান তুরিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে একসাথে মাস্টার্স শেষ করেছিল দুজন। তুরিন ছিল ইতালিপ্রবাসী বাবা তোফায়েল আলমের একমাত্র আদুরে কন্যা, আর ইমরান এ অঞ্চলের ধনাঢ্য পরিবারের একমাত্র ছেলে। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা, তারপর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা। কিন্তু জটিলতা শুরু হলো তখন, যখন তুরিনের বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েকে উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে ইতালিতে নিয়ে যাবেন।
প্রিয়মানুষকে দূরে হারানোর শঙ্কায় ব্যাকুল তুরিন হঠাৎই একদিন নিজের পরিবারে সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ করে দেয়। তুরিনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বাবা-মা প্রথমে দমে গেলেও, আবেগপ্রবণ মেয়ে পাছে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলে-এই ভয়ে নিজেদের ভেতরের ক্ষোভ সামলে নেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন, বিয়ের সূত্রে ইমরানকেও ইতালিতে নিয়ে যাবেন।
কিন্তু বাদ সাধল ইমরানের পরিবার। অভিজাত ও ধনাঢ্য পরিবারের একমাত্র সন্তানকে কোনো অবস্থাতেই তাঁরা প্রবাসে পাঠাবেন না। তাঁদের সাফ কথা-তুরিন যদি দেশে ফিরে সংসার করে, তবেই এই সম্পর্ক মেনে নেওয়া সম্ভব। খবরটা তুরিনের বাবার কানে পৌঁছাতেই তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত লাগে, তিনি এক কঠোর অবস্থান নেন। তুরিনকে পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গভীরে ঢুকতে না দিয়ে, কৌশলে তাকে নিয়ে পাড়ি জমান ইতালিতে।

Shamol Bangla Ads

তারপরের দিনগুলো ছিল নিঃসঙ্গতার। একদিন অচেনা এক আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ভেসে এসেছিল কাঙ্ক্ষিত সেই কণ্ঠ-
-‘হ্যালো… ইমরান? তুরিন বলছি।’
হঠাৎ বিদেশি অজানা নম্বর দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন অধ্যাপক ইমরান হাসান। বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে উঠেছিল। কাঁপা কণ্ঠে শুধু এটুকুই জিজ্ঞেস করতে পেরেছিলেন, ‘কেমন আছো, তুরিন?’
ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল একফালি বিষণ্ন হাসি, ‘কতটা আর ভালো থাকা যায় বলো? মনটা তো ওখানেই ফেলে এসেছি।’
-‘সে কথা আমারও, তুরিন… আমি এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে নেই।’

তুরিনের কণ্ঠে তখন অনুযোগ আর আকুলতার মিশ্রণ, ‘যেটা প্রায় অসম্ভব ছিল, আমি বাবার পায়ে ধরে সেটাতেই রাজি করিয়েছিলাম, ইমরান ! অথচ তুমি সেই সুযোগটা হেলায় হারালে? আমাদের ভালোবাসার এই মূল্য দিলে তুমি?’
ইমরান দীঘির জলের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিয়েছিলেন, ‘এখানে মূল্যায়নের বিষয় নয় তুরিন। বিষয় দুটো পরিবারের অহংকার আর ইগোর। তা ছাড়া, তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরানোই যদি প্রবাসে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে তুমি সব জেনেও না বোঝার ভান করে চলে গেলে কেন?’
-‘তুমি ভুল ভাবছ, ইমরান !’ তুরিনের গলা ধরে এসেছিল, ‘আমার বাবা-মা আমার কোনো চাওয়ার বিরুদ্ধে যান না। তুমি জেদ ছাড়ো… তুমি এখনো চলে এসো আমার কাছে। আমরা সব নতুন করে শুরু করব।’
-‘না তুরিন, না… আমি বাবা-মায়ের অমতে, এই আত্মসম্মানের লড়াইয়ে হার মেনে ওভাবে দেশ ছেড়ে যেতে পারব না।’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর খুব ধীর ও বরফশীতল কণ্ঠে তুরিন বলেছিল, ‘ঠিক আছে ইমরান। এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। তবে শেষ একটা কথা শুনে রাখো—তুমি যদি এই সিদ্ধান্ত না পাল্টাও, নিশ্চিত থাকো আমার ওপর অন্য কোথাও বিয়ের চাপ বাড়বে। আমি হয়তো আর বেশিদিন প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারব না।’
ইমরান নিচু স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি তো কোনোটাই অস্বীকার করছি না তুরিন—না আমাদের সম্পর্ক, না এই পরিস্থিতি। তবে আমি আজও তোমাকে একই কথা দিচ্ছি, তুমি শুধু এই দেশে, তোমার নিজের মাটিতে ফিরে এসো… আমরা খুব দ্রুতই ঘর বাঁধব, ইনশাআল্লাহ।’
-‘আর আমি যদি কোনোদিন ফিরতে না পারি? তবে কি আমাদের ঘর বাঁধার স্বপ্নটা এভাবেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে?’

তুরিনের সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর সেদিন ইমরানের কাছে ছিল না। নিথর হয়ে শুধু ফোনের ওপাশের নিরবতা শুনেছিলেন।
তুরিন তার বাবার কাছে আবার আকুতি জানিয়েছিল ইমরানের কাছে ফেরার জন্য। কিন্তু মেয়েকে ভাঙতে দেখে বাবা কৌশলে বদলে ফেলেন তুরিনের মোবাইল নম্বর। বাড়িয়ে দেওয়া হয় কড়া নজরদারি। প্রিয়মানুষের এমন দূরত্ব, যোগাযোগহীনতা আর ভালোবাসার অপমৃত্যুর শোকে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে সহজ-সরল মেয়েটি। মনস্তাত্ত্বিক এই চরম যন্ত্রণা একসময় রূপ নেয় মরণব্যাধি ক্যানসারে। মায়াবী মেয়েটার শরীর দিনে দিনে খয়ে যেতে থাকে। বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, দুজনের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আজ এতগুলো বছর পর, ঘাটের সান্ধ্যকালীন ঠাণ্ডা বাতাসে ইমরানের শরীর কেঁপে ওঠে।
হঠাৎ করেই যেন স্মৃতির পর্দা ছিঁড়ে বাস্তবে ফিরে আসেন তিনি। এই তো আজ সকালেই পাশের মহল্লার দেশবাড়িতে এসে থামল এক সায়রেন বাজানো অ্যাম্বুলেন্স। খবরটা শোনামাত্রই বুকে এক অজানা শঙ্কা নিয়ে পা বাড়ান ইমরান । নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি, উন্মাদের মতো ছুটে গিয়েছিলেন সেই চেনা উঠানে।
কিন্তু গিয়েই থমকে যান অধ্যাপক ইমরান হাসান। এত লোক কেন উঠোনজুড়ে? চারপাশের বাতাস কেন কান্নার ভারী বাষ্পে এত নিঃশ্বাসরোধী? কেন মাতম উঠেছে পুরো বাড়িময়?
ইমরানের অপলক চোখের সামনে তখন অ্যাম্বুলেন্সের পেছন থেকে ধীরে ধীরে নামানো হচ্ছে একটি বিশেষ আইস বক্স। স্বচ্ছ কাচের ওপাশে শুয়ে আছে এক হাড়কাঁপানো হিমশীতল দেহ।
তুরিন ফিরেছে।

বাবার জেদ, পরিবারের ইগো কিংবা প্রবাসের সুউচ্চ প্রাচীর-কোনো কিছুই তাকে আর আটকে রাখতে পারেনি। ইমরান নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বরফাচ্ছাদিত সেই কফিনের পানে তাকিয়ে তাঁর মনে হলো-তুরিন ঠিকই তার দেওয়া কথা রেখেছে। সে ফিরে এসেছে তার নিজের মাটিতে, তার ইমরানের খুব কাছাকাছি। শুধু ঘর বাঁধার আর কোনো ব্যাকুলতা নেই তার শান্ত দুটি চোখে।

লেখক : কবি, লেখক ও গীতিকার।

Need Ads