পাঠচক্র এমন একটি অভিধা বা প্রক্রিয়া যা মূলত কোন বিশেষ বিষয়ে বোদ্ধা বা অভিজ্ঞ হওয়ার অভিপ্রায়ে পুনঃপুন বিষয়টি সম্পর্কে প্রবন্ধ,নিবন্ধ বা আলোচনা উপস্থাপন, সমালোচনা বা পঠন পাঠনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে বা শীর্ষে উপনিত হওয়া বা কোন নির্দিষ্ট জ্ঞানের শিখরে আরোহণ করা বা কোন আদর্শের চূড়ান্ত রূপরেখায় উন্নীত হওয়া। যেমন বইপড়া, সাহিত্যচর্চা, বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞানার্জন বা গান, নাচ, স্বাস্থ, খেলাধুলা কিংবা রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা ইত্যাদি। পাঠচক্র এমন একটি বিষয় যা আমাদের সৃজনশীলতার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও চিন্তাশক্তির পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পাঠচক্র রাখতে পারে একটি শক্তিশালী ভূমিকা। এটি একটি মঞ্চ – যেখানে আমরা কেবল পাঠ- ই করি না বরং পঠিত বিষয়ে ভাবনা, আলোচনা, মতবিনিময় করি এবং ভিন্নদৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারি। আর তাই সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম এই পাঠচক্র। আজকের অনুষ্ঠান যেহেতু কবি সংসদের অনুষ্ঠান, কবিদের অনুষ্ঠান, তাই আজকের পাঠচক্র নিশ্চয়ই কবিতা পাঠ, কবিতার ভাবনা, আলোচনা,মতবিনিময় ও কবিতার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পৃক্ত।

কবিতা পাঠ শুধু কবিতাকে পড়া নয়, আওড়ে যাওয়া নয়,উচ্চারণমাত্র নয়- কবিতা পাঠ মানে কবিতা নিয়ে চিন্তা জাগানো আর চিন্তার সেই আলোতেই কবিতা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয়। এখানে একজন পাঠক শুধু পাঠক নন – একই সাথে একজন চিন্তকও হয়ে ওঠেন সমান্তরালে। এখানে কবিতা পাঠকের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ ও অধিকার থাকে। আর এই সামষ্টিক ক্রিয়া-কর্মাদির পথ ধরেই ধীরে ধীরে একজন কবির মননশক্তির বিকাশ ঘটে। পাঠচক্র সহনশীলতা ও মতভেদকে সম্মান করতে শেখায়। শেখার পাশাপাশি শ্রদ্ধার মনোভাবও তৈরি হয়। একে অপরের চিন্তাধারার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মননশীলতার পরিচায়কও বটে- যা আমরা পাঠচক্রের চর্চা থেকে লাভ করি। আমরা যাঁরা কবি, যাঁরা শব্দ নিয়ে ছবি আঁকি, অনুভব ও বোধ দিয়ে ভাবনা রচনা করি, তাদের পথচলাটা শুরু হয় হয়তো একটা শব্দ,একটা পঙক্তি, কিংবা একটা কবিতা বা কবিতার বই দিয়ে – যা আমাদের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে আরও অনেক আলো খুঁজে ফেরে – এই খোঁজের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে কবিদের সম্মিলিত পাঠচক্র। কবিদের পাঠচক্র মানে কেবলই কবিতা পড়া নয়-এটি ভাবনার বিনিময়,অনুভবের আদান প্রদান ও যুক্তির সাধনা। কবিদের পাঠচক্রের নানা ভাবনা ও বোধে আমরা নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারি। এখানে একক চিন্তা দলবদ্ধ আলোচনায় হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন– ‘যেখানে মনের ওপর মন এসে পড়ে সেখানেই মনন জন্মায়’। পাঠচক্র যেন ঠিক সেই মননের জায়গাটিই সৃষ্টি করে। কবিতার শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকে চিন্তা, চিন্তার পেছনে মনন আর মননের জাগরণে জেগে ওঠে প্রতিভার দীপ্তি। পাঠচক্র সেই দীপ্তিময় আত্মচর্চার স্থল যা পাঠক ও চিন্তক দুটিকেই জাগিয়ে তোলে। সকলেই জানি, একজন কবি বা শিল্পীর প্রতিভা একদিনে বিকশিত হয় না এর পিছনে থাকে নিয়মিত পাঠ ও আলোচনা। পাঠচক্রের মাধ্যমে কবিরা শব্দ চয়ন, ভাব প্রকাশ এবং কবিতার নান্দনিকতা শিখতে পারেন- শিখতে পারেন কবিতা কেবল অনুভবের নয় বিশ্লেষণেরও। পাঠচক্র কবিদের সেই বিশ্লেষণ করতে শেখায়, সাহিত্য বোঝার জন্য যে বোধের দরকার হয় তাকে শাণিত করে। নতুন কবিদের জন্য এটি আত্মপ্রকাশের ও গঠনমূলক আলোচনা -সমালোচনার জায়গা। কবিরা যেহেতু শব্দের কারিগর, ভাবনার ভাস্কর – তাই কবিদের জন্য পাঠচক্র মানে নতুন ভাবনার উজ্জ্বল দিগন্ত। আমরা যদি কবিতার প্রতিভার কথা বলি তাহলে বলতে হবে প্রতিভা কোন অলৌকিক ঘটনা নয়-এটি একটি অন্তর্নিহিত শক্তি যা সময়,সাধনা ও পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। পাঠচক্র সেই পরিবেশ তৈরি করে। পাঠচক্রে অন্তর্ভূক্ত হয়ে একজন নতুন কবি যখন নিজের লেখা পাঠ করেন এবং তার কবিতা সম্পর্কে অন্যদের মতামত শোনেন তখন তিনি তার লেখায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে শেখেন। তিনি শেখেন শব্দের চেয়ে অনুভব জরুরী, শেখেন বাক্য ছন্দের সাথে ভাবের মিলও। এইভাবে পাঠচক্রের মাধ্যমে একজন শিক্ষানবিস কবি কবিতা বিজ্ঞতা লাভ করেন। পাঠচক্র একজন কবিকে শুধু পাঠক নয় -একজন চিন্তাশীল পাঠকে পরিণত করে। আর সেই চিন্তাশীলতাই কবিকে করে তোলে বিশ্লেষক, নির্মাতা- একজন সত্যিকারের স্রষ্টা।
আবার মনন বিকাশেও পাঠচক্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মনন এমন এক জাগতিক শক্তি যা অনুভূতি ও যুক্তির দৃঢ়তাকে একত্রে ধারণ করে। আর পাঠচক্র সেই মননের খনি। যেখানে কবির প্রশ্ন করার সাহস, উত্তর খোঁজার আগ্রহ, মতভেদ মেনে নেওয়ার সৌন্দর্য চর্চা হয়। পাঠচক্র নিজের ও অপরের লেখাকে উপলব্ধি করতে শেখায় – গড়ে তুলতে শেখায় পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়াও। এখানে একজন কবি যেমন রবীন্দ্রনাথ পড়েন তেমনি একজন নবীন কবির কবিতাও চর্চার বিষয় হয়। একজন কবির জন্য পাঠচক্র অপরিহার্য কেন? – কবিতা একাধারে ব্যক্তিগত আবার সামষ্টিক।।আমি যা অনুভব করি তা অন্যজন হযতো ভিন্নভাবে অনুভব করেন। কবিতার এই ভিন্ন পাঠ বোঝার জন্য পাঠচক্রের দরকার – যা কবিকে ভিন্ন পাঠ জানার সুযোগ তৈরি করে দেয়। একজন কবি যত পাঠ করবেন, যত আলোচনা করবেন ততই তার ভাষা,ভাবনা ও কাব্যরুচি গভীর হবে। পাঠচক্র তাকে দেবে আত্মবিশ্বাস তাকে দেবে আত্মপ্রকাশের সাহস এবং ভুল স্বীকার করে নেবার মানসিকতা। এই সময়ের সাহিত্যচর্চা শুধু একক সাধনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না আমাদের প্রয়োজন যৌথ চর্চার, চিন্তার লেন-দেনের, হৃদয়ের আদান- প্রদানের। আর পাঠচক্র কবিদের জন্য সেই কাজটিই করে।

আমরা যাঁরা কবি, আমাদের উচিত এমন পাঠচক্র তৈরি করা যেখানে নবীন ও প্রবীণ কবিরা পাশাপাশি বসে, পঙক্তির পেছনের বেদনা অনুভব করে, ভাবনার ছায়ায় নতুন আলো খুঁজে নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের পাঠচক্র অনেক বোদ্ধা কবির জন্ম দিয়েছিল এবং রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ছিল যেন এক অমীয় পাঠচক্রের উদাহরণ যেখানে গেল জীবনকে করা যেত সম্যক উপলব্ধি। কবিদের জানা উচিত-শব্দ যতই শক্তিশালী হোক – তা আলো ছড়ায় তখনই যখন তা চিন্তার আগুনে দগ্ধ হয়। আর পাঠচক্র হচ্ছে সেই দহন ক্ষেত্র। পাঠচক্র মননের ব্যায়াম, চিন্তার দিগন্ত এবং প্রতিভার আলোকপথ। পাঠ করো, চিন্তা করো, বিনিময় করো -এই হোক আমাদের কবিসভা, এই হোক আমাদের মননের মেলা।
(প্রবন্ধটি সেঁজুতি সাহিত্য সংসদের একুশে পাঠচক্রের শততম আসরে প্রধান আলোচক হিসেবে পঠিত।)
লেখক : কবি, ছড়াকার ও শিক্ষক।




