শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের উত্তর গড়কান্দা এলাকার বাসিন্দা চাতাল শ্রমিক মোছা. খোদেজা বেগম (৫৫)। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর চাতালে কাজ করেই অনেক কষ্টে একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। চাতালে কাজ করেই দুই ছেলেকেও বিয়ে করিয়েছেন। তবে এখন আর খোদেজার খোঁজ রাখে না কেউ। প্রায় চার মাস যাবত চাতাল বন্ধ থাকায় নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাঁর। নিজের তিন বেলা খাবার যোগাতে কখনও মানুষের বাসায় কাজ করছেন, কখনও আবার হাত পাতছেন মানুষের কাছে।
এমন কষ্টে শুধু খোদেজা একা দিন পার করছেন না। উপজেলার অধিকাংশ চাতালকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর মতো হাজারও নারী ও পুরুষ শ্রমিকের এখন দুরবস্থা। জীবিকার তাগিদে কেউ পেশা বদল করেছেন। কেউ আবার বাধ্য হয়েই বেছে নিয়েছেন ভিক্ষাবৃত্তি।

গতকাল রবিবার সকালে চাতাল শ্রমিক খোদেজা বেগমের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসময় খোদেজা বেগম বলেন, ‘যহন চাতালে কাজ আছিলো তহন সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড় ভাঙা খাটুনির পর ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মজুরী পাইতাম। অই টাকা দিয়াই সন্ধ্যায় বাজার কইরা কোন মতে দুই মুঠ খাইয়া পইড়া বাঁচতাম। কিন্তু অহন প্রায় ৪ মাস ধইরা চাতালে কাম বন্ধ। পেট তো আর কিছু মানে না। অহন খাওয়ুন জুগাইতে মাইন্সের বাড়িত কাম খুঁজি। আর কাম না পাইলে হাত পাতা ছাড়া উপায় থাহে না। কিন্তু বাবা মাইন্সের কাছে চাইয়া খাইতে কষ্ট লাগে। আল্লাহ হাত দিছে, আমি কাম কইরাই খাইবার চাই।’
চালকল মালিক ও চাতাল শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও উপজেলায় ১০৫ টি চালকল ছিলো। চালকলের চুলাগুলোতে এক সময় দাউ দাউ করে ২৪ ঘন্টা আগুন জ্বালিয়ে সিদ্ধ করা হতো ধান। সে আগুন নিভে গেছে অনেক আগে। ভরে গেছে পরগাছায়। সে সময় চাতাল ব্যবসাকে ঘিরে উপজেলার অর্থনীতি ছিল রমরমা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নানা প্রতিকুলতায় আজ ধ্বংসের পথে এই চাতাল শিল্প। লোকসান গুনতে গুনতে রাস্তায় দাঁড়ানোর অবস্থা এ ব্যবসায় জড়িতদের।
বিগত কয়েক বছর ধরেই চরম মন্দা চলছে এ ব্যবসায়।এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলেন, চাতালের জায়গা দখল করে নিয়েছে আধুনিক ড্রায়ার ও অটোরাইস মিল। এছাড়া গত ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগাম বন্যা দেখা দিলে খাদ্যমন্ত্রী ভারত থেকে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদনি করেন। ফলে চালকল মালিকেরা তাদের চাল বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়ে যান। উপজেলায় এখন মাত্র ৫-৭ টি চাতাল চালু আছে। পুঁজি হারিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১০০ টি চাতাল। বেকার হয়েছে হাজারও নারী ও পুরুষ শ্রমিক। বেকার শ্রমিকরা জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে পেশা বদল করে কেউ চালাচ্ছেন অটোরিকশা আর নারীদের কেউ করছেন ভিক্ষা, কেউবা ঝিয়ের কাজ। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পারি জমিয়েছেন রাজধানীতে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণের বোঝায় দিশেহারা ব্যবসায়ীরা চাতালের জমি বিক্রি করে পরিশোধ করছেন ব্যাংকের ঋণ। চাতাল বন্ধের পিছনে ভারত থেকে চাল আমদানী, গুদামে সিন্ডিকেট করে চাল বিক্রি করাসহ নানা কারণকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। এমতাবস্থায় সরকারি প্রণোদনা পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন অসহায় এই ব্যবসায়ীরা।
চাতাল শ্রমিক মোছা. ফাতেমা বেগম বলেন, একলগে যারা চাতালে কাম করতাম হেগর (তাঁদের) অনেকেই অহন ঢাকায় গেছেগা। কাউরে দেহি ভিক্ষা করে। মহাজন (চাতাল মালিক) না বাঁচলে আমগরেই বেতন দিবো কেমনে? মিলে তো চাল জইমা রইছে। সরকার যদি আমগরে না দেহে তাইলে না খাইয়া মরনের দশা অইবো। জয়লক্ষ্মী চালকলের ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, কয়েকমাস আগেও এই চাতালে একসাথে একশ শ্রমিক কাজ করতো। কিন্তু এখন চাতাল বন্ধ। গত মৌসুমেরই অনেক চাল জইমা আছে। মহাজন নতুন কইরা ধান কিন্না আর কি করবো। অহন চাতাল পাহারা দেওয়ার জন্য আমরা কয়েকজন মিলে থাকি।
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি অসীম দত্ত হাবলু বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারে অটোমেটিক রাইস মিলগুলোতে কম শ্রমিকে বেশী উৎপাদন করতে পারে। ফলে তাদের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় সাধারণ চাতাল মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়াও সরকার ভারত থেকে চাল আমদানী করায় আমাদের চালের চাহিদাও কমে গেছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আসাদুজ্জামান রওশন বলেন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তির কারণে চাতাল কল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই দেনার দায়ে চালকল বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে মালিক-শ্রমিক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।সরকার বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ালে চাতাল শিল্পকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।




