হতাশায় ‘ইউটিউবার’, ‘জমিদার’, ‘রাজা’, ‘বাদশা’র খামারিরা

এবারের কোরবানি ঈদে শেরপুরের অনেক খামারির স্বপ্ন পূরণ হয়নি। লাভের আশায় পশু পালন করে ঈদে ন্যায্য মূল্য তো দূরের কথা, লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে চেয়েও ক্রেতা পাননি তারা। ওই অবস্থায় এবারের ঈদে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কোরবানির পশু ‘ইউটিউবার’, ‘জমিদার’, ‘রাজা’, ‘বাদশা’সহ বাহারি নামের পশুগুলোসহ জেলায় অবিক্রিত রয়ে গেছে ৩১ হাজার পশু। ফলে হতাশায় ভুগছেন সেইসব খামারিসহ গরু বিক্রেতারা। অথচ একই ঈদে গত বছর অবিক্রিত পশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ হাজার। গরু বিক্রেতারা বলছেন, এবার হাটে-হাটে ঘুরেও তারা বড় গরুর ক্রেতার দেখা পাননি। তাই ভগ্নহৃদয়ে হাট থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন আশাহত তারা। শুধু গরু নয়, এবারের কোরবানির পশুর হাটে বড় ছাগলের দামও ছিল অনেক কম। ন্যায্য দামে ছাগল বিক্রি করতে না পেরে জবাই করে মাংস বিক্রি করেছেন অনেকেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার কোরবানি উপলক্ষে শেরপুরে বিক্রির জন্য প্রস্তুত ছিল ৮৪ হাজার ৪১৭টি পশু। কিন্তু জেলার ১৮টি পশুর হাটে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫২ হাজার ৭৩৩টি পশু। এতে ৩১ হাজারের কিছু বেশি পশু অবিক্রিত রয়ে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ আশা করেছিল জেলা থেকে কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার পশু রাজধানীসহ দেশের বড় হাটগুলোতে বিক্রি হবে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি খামারি, ব্যবসায়ী, কৃষক ও ইজারাদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শেরপুর, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলার পশুর হাটগুলোতে বড় গরুর ক্রেতা আসেন ঢাকা-গাজীপুর ও ময়মনসিংহ থেকে। বন্যাসহ নানা কারণে এবার পশুর হাটে বাইরের পাইকারদের আনাগোনা একেবারেই ছিল না। তাই বড় ও বেশি দামের গরু বিক্রি হয়নি। জেলা শহরের কান্দাপাড়া মহল্লার খামারি তাহমিদ ইসরাক অলিদ। তিনি ঈদে বিক্রির জন্য ৩টি ষাঁড় লালনপালন করেন। তার ষাঁড় ৩ ট জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। বড় ষাঁড়টির নাম ‘জমিদার’। এর ওজন ৩১ মণ। এছাড়া তার ‘রাজা’ নামের ষাঁড়ের ওজন ২৫ ও ‘বাদশা’ নামের ষাঁড়ের ওজন ২২ মণ। এবারের হাটে বড় গরুর চাহিদা ও ক্রেতা কম থাকায় ৩ হাট ঘুরে একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, লাভের আশায় গরু পুষে বোকা বনে গেছেন। তার ‘জমিদারে’র পেছনে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ টাকা খরচ হয়। ২ বছর আগে তাকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। শুধু খাবারের হিসাব করলে এ গরুর দাম হয় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা এর দাম বলেন ৪ লাখ টাকা। রাজার দাম ৩ লাখ ও বাদশার দাম আড়াই লাখ টাকা বলার পর ক্রেতা না পেয়ে তিনটি ষাঁড়কেই তিনি বাড়ি নিয়ে এসেছেন।
আরেক খামারি সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের পশ্চিম কুমড়ী গ্রামের খামারি সুমন মিয়া। তার ৩০ মণ ওজনের ষাঁড় ‘ইউটিউবার’-কে বেশ কয়েকটি হাটে নিয়ে বিক্রি করতে পারেননি। লালনপালনে যা খরচ করেছেন, ইউটিউবারের দাম তার চেয়ে অনেক কম। তিনি হতাশ কণ্ঠে আরও বলেন, ‘আর গরু পালমু না। এক হাটে গাড়ি করে নিয়া গেলে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এইভাবে ৩টি হাটে নিয়া গেছি। কিন্তু ক্রেতা পাই নাই। না নেওয়ার মতো দাম করে।’
সদর উপজেলার কামারেরচর হাটের ইজারাদার সুজন কর্মকার বলেন, এবার ইজারা নিয়ে টাকা ওঠাতে পারেননি। সাম্প্রতিক বন্যায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেই কোরবানি দেননি। আবার গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় খামারিদের গরু পুষতে অনেক বেশি খরচ হয়েছে। সেই তুলনায় দাম ছিল অনেক কম।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার পশু বিক্রি কিছু কম হয়েছে। জেলার উদ্বৃত্ত ১৫-২০ হাজার গরু বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যায়নি ও বিক্রিও হয়নি। জেলায় বড় গরু কেনার মতো ক্রেতা কম। আবার খরচের হিসাব করে অনেকেই গরু বাইরে নিয়ে যাননি। তার মতে, গত কোরবানি ঈদে ৫ হাজার পশু অবিক্রিত ছিল। কিন্তু নানাবিদ সমস্যায় এবার তা কয়েকগুণ বেড়েছে।




