যে বয়সে পড়াশোনা ও খেলাধূলায় ব্যস্ত থাকার কথা ১৫ বছর বয়সী রাব্বানীর, সেই বয়সে ঘরের কোণে শুয়ে শুয়ে কঠিন দিন পার করতে হচ্ছে তাকে। খেলাধূলা তো দূরের কথা, উঠে বসতেও পারে না সে। মুখ ভরা মলিন চোখে ঘরের কোণায় সারাদিন শুয়েই দিন কাটে তার। রব্বানী শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরুণা ইউনিয়নের জলঙ্গা মাধবপুর গ্রামের ভ্যানচালক উসমান আলীর ছেলে।

রাব্বানীর পরিবার জানায়, জন্মের পর সুস্থ-স্বাভাবিকই ছিল রাব্বানী। দুই বছর বয়সের সময় হঠাৎ জ্বর উঠে তার। জ্বরের চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবার। পরবর্তীতে জ্বর ভালো হলেও তার দু’টি পা অচল হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময় চিকিৎসা করালেও আর সুস্থ হয়ে উঠেনি রাব্বানী। আর এভাবেই ১৩টি বছর ধরে কাটছে ঘরের কোণে। কারণ ভ্যানচালক দরিদ্র বাবার পক্ষে ছেলেকে একটি হুইল চেয়ার কিনে দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনমতে ৫ সদস্যের সংসার চলে তাদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে রাব্বানী। প্রতিবেশি শিশুরা যখন স্কুলে যাচ্ছে, রাব্বানী শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে। আর পাশেই শিশুরা যখন খেলাধূলা করছে, রাব্বানী তখন বাবার ঘাড়ে উঠে একটু বাইরে আলো-বাতাসের শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে।
রাব্বানীর বাবা ভ্যানচালক উসমান আলী বলেন, আমার ৩ ছেলের মধ্যে সবার বড় রাব্বানী। জন্মের পর ভালাই আছিল সে। হঠাৎ করে জ্বর আহে (আসে) তার শইল্লে (শরীরে)। এরপর থাইকাই (থেকে) দুই পা অবশ হয়ে যায়। আর ঠিক হয় নাই। মেলা (অনেক) চিকিৎসা করাইছি, কিন্তু ভালা অয় (হয়) না। এখন টেহাও (টাকাও) নাই, আর চিকিৎসাও করবার পারি না। এডা (একটা) প্রতিবন্ধি কাট (কার্ড) করে দিছে। ৩/৪ মাস পর পর ২২৫০ টেহা করে আহে (আসে), কতবার আবার আহে (আসে) না।’তিনি আরও বলেন, ঠিক মতো ভাত খাবার পাই না পোলারে কইথনে (কই থেকে) চিয়ার (হুইল চেয়ার) কিনে দিমু। সারাদিন ভ্যান চালাইয়ে যে কয়ডা টেহা (টাকা) পাই, কোন মতে সংসার চালাই। আমার সংসারে আমি ছাড়া আর কোন কামাইদার নাই। এই ভ্যান চালাইয়ে জীবনডা পার করতাছি।

মা লাভলী বেগম বলেন, খুব কষ্ট কইরা পোলাডারে (ছেলেকে) পালতাছি (লালন-পালন)। এই পোলাডারে ঘাড়ে কইরা বাইরে নিয়ে যাই আবার আনি। বিরাট কষ্ট হ, কেউ পোলাডার দিকে চাই না। আমার পোলাডারে কেউ এডা চেয়ার ভিক্ষা দিলে আমি কষ্ট থেকে মুক্তি পাইতাম। মেলাজনের (অনেকজনের) কাছে গেছিলাম কেউ এডা চেয়ার দেই না। পোলাডারে ডাক্তারও দেহাবার (দেখাবার) পাইতাছি না টেহার (টাকার) জন্য। আগে যা আছিল সব বেইচি (বিক্রি করে) শেষ হইছে এখন আর অসুধও (ঔষধ) দিবার (কিনতে) পাই নে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, অনেকদিন ধরে আমরা দেখতাছি খুব কষ্টে আছে তারা। এই ছেলেটা ছোট বেলায় ভালো ছিলো, হঠাৎ করেই তার দুই পা অচেতন হয়ে যায়। জমি-জমা তেমন ছিল না, তবে যতটুকু ছিল সবটুকু বিক্রি করে ছেলেকে চিকিৎসা করিয়েছে। আর টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারেনি। তাই রাব্বানীর জন্য কেউ যদি একটি হুইল চেয়ার কিনে দে, তাহলে তাদের পরিবারের কষ্টটা একটু হলেও দূর হবে। আর বাইরে আসতে পারবে রাব্বানী। একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল সাত্তার বলেন, এই পোলাডারে এডা চিয়ের (হুইল চেয়ার) মিল (ব্যবস্থা) করে দেন, আনহেরা (আপনারা) চেষ্টা করলে এডা চিয়ের (হুইল চেয়ার) পাওন যাবো। আর এই চিয়েরে (হুইল চেয়ারে) বয়ে (বসে) এই পোলাডা এল্লা হলেও আরাম হবো।
এ ব্যাপারে সিংগাবরুণা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফকরুজ্জামান কালু বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। আমি আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম। এখন আমি খোঁজ-খবর নিবো এবং পরিষদ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব আমি চেষ্টা করবো।




