শেরপুর সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের পুঁটিজানা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মানিক (১৮) ছোটবেলা থেকেই অটিজমে আক্রান্ত। সে সবকিছুতে ভীষণ ভয় পায়। মনে রাখতে পারে না অনেক কিছুই। কিন্তু সব বাধা ও ভয়কে জয় করে এবার ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তার এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র শেরপুরের আফছর আলী আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

জানা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের তারাগড় নামাপাড়া গ্রামের মো. জয়নাল ও মাজেদা বেগম দম্পতির ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে মানিক সবার বড়। ছোটবেলায়ই বাবা-মা বুঝে গিয়েছিলেন তাদের ছেলে আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিক নয়। ৪ বছর বয়স পর্যন্ত সে হাঁটতে বা দাঁড়াতে পারেনি। অল্প অল্প কথা বললেও সেটা ছিল অস্পষ্ট। পরে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন ও ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয় মানিককে। এতে ধীরে ধীরে মানিকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। আস্তে আস্তে দাঁড়াতে ও হাঁটতে শিখে সে। তবে সমবয়সীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে সে।
৭ বছর বয়সে মানিককে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার পর পাকুড়িয়া ইউনিয়নের পুঁটিজানা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় সে। ২০১৮ সালে জিপিএ-২.৭৫ পেয়ে জেএসসি পরীক্ষায় পাস করে। আর এ বছর ওই বিদ্যালয় থেকেই মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে মানিক।

১৫ নভেম্বর সোমবার আফছর আলী আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, একটি বেঞ্চে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখছে মানিক। প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী হিসেবে নির্ধারিত সময় দেড় ঘণ্টার চেয়ে ২০ মিনিট সময় বেশি পাচ্ছে সে। পরীক্ষা শেষে মানিকের সাথে কথা হলে সে জানায়, ভালোভাবে পড়ালেখা করেছি। আশা করি ভালো ফল পাব। লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হতে চাই।
আফছর আলী আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী কেন্দ্রসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, সমাজে অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া বাদ দিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। অথচ মানিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হলেও পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের শিক্ষার্থীদের আরও সহযোগিতা করা প্রয়োজন। যাতে তারা ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
মানিকের বাবা মো. জয়নাল দরিদ্র কৃষক। কোনো রকমে সংসার চলে। অভাবের মধ্যেও মানিকের চিকিৎসা ও পড়ালেখা অব্যাহত রেখেছেন। মানিক বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসে ৭০০ টাকা করে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে।
মো. জয়নাল বলেন, অন্য শিশুদের মতো মানিক হইচই ও খেলাধুলা করে না। কথা কম বলে। সবকিছুতেই তার মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারে না। তবে গাছের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা আছে। পড়ালেখার ফাঁকে সে গাছে পানি দেয়। গরু-ছাগলের হাত থেকে গাছ বাঁচাতে বাঁশ দিয়ে নিজেই খাঁচা তৈরি করেছে। এসএসসি পরীক্ষায় পাস করতে পারলে ছেলেকে কলেজে ভর্তি করাবেন। তিনি ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।




