এস এম জামাল, কুষ্টিয়া : শেষ হয়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ৫ দিনব্যাপী স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) অশোক কুমার বিশ্বাস । তিনি বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ সকল ধর্মের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সদা সত্য পথে চলতে মানুষকে মানবতাবাদীর পথে ডাক দিয়ে ছিলেন। তিনি অহিংস মানবতার ব্রত নিয়ে দেহতত্ব, ভাবতত্ব, গুরুতত্বসহ অসংখ্য গান সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর এই অমর সৃষ্টি সঙ্গীত কোন ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সকল ধর্মের উর্ধে থেকে সম্প্রীতির বাধনে আবদ্ধ করতে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ মানব মুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। লালন ফকিরের জাতহীন মানব দর্শন ও সঙ্গীত সার্বজনিন বিদিত বিশ্বাঙ্গনে। গতকাল বুধবার রাতে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে মরমী বাউল সাধক ফকির লালন শাহের ৫ দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সকলকে নিয়ে মানবতার ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতে একটি অসাম্প্রদায়ীক চেতনার সাম্যের সমাজ চেয়ে ছিলেন। লালন মানুষকে শিখিয়েছিলেন কোন ধর্মের মধ্যে আবদ্ধ থেকে সম্প্রীতি বজায় রাখা যায় না। সকল ধর্মের উপর মানব ধর্ম। তিনি আরো বলেন, লালন নিজেকে কখনো বিশেষ পরিচয় দেননি। রবীন্্রদনাথ ঠাকুরের পরিবারের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। ১৮৮৯ সালের ৫মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের একটি ছবি স্কেচ করেছিলেন। প্রাজ্ঞ আলোচক ও গবেষকদের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাইয়ের নিজ হাতে আঁকা লালনের প্রকৃত ছবি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মানুষ তার জন্ম দিয়ে পরিচিতি লাভ করেন না। সে কি ব্যক্তি পরিচিত হয় তাঁর কর্মের মধ্যে দিয়ে। লালন তাই তাঁর জাতহীন মানব দর্শনে নিজেকে ঠিক সেভাবেই বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তোলেন। তিনি নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠায়ও কাজ করেছেন।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর সহযোগিতায় ও লালন একাডেমির আয়োজনে পাঁচদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে সভাপতিত্ব করেন, লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মর্কতা কে. এম. রাহাতুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান খান চৌধুরী মুকুল। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, লালন একাডেমির নির্বাচিত সদস্য মাহমুদুর রহমান আল কাদরী। প্রধান আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন ঢাকা ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই আগত অতিথিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া ও ক্রেষ্ট দিয়ে বরণ করে নেন।
আলোচনা সভা শেষে লালন মঞ্চে লালন একাডেমি শিল্পীরা লালন সঙ্গীত পরিবেশন করেন। দর্শক-শ্রোতারা কখনো পিন-পতন নীরবতায় গান শুনছেন আবার কখনো গানের তালের সাথে সাথে করতালি দিয়ে মুখর করে তুলছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আখড়াবাড়ীর আঙ্গীনা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ৫ দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের অনুষ্ঠানের সার্বিক উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেন কবি ও কণ্ঠরাজ শুকদেব সাহা ।
এবারের স্বরণোৎসবের অনুষ্ঠানে আসা দেশ-বিদেশের লাখ ভক্ত অনুরাগী ও সাধু-গুরুদের চরণ ধূলায় সিক্ত বাউল সম্রাটের ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ী। সাঁইজির মতাদর্শের ধর্ম আর জাতি ভেদাভেদ ভুলে মানুষের কল্যাণে মানুষ নিবেদিত থাক চিরকাল এবং মানবতার নিগুড় প্রেমের ভাবধারা বর্তমান সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে ভক্তকুলের অঙ্গীকার। সভ্যতার এই যুগে মানুষ মানুষে হিংসা বিদ্বেশ ভূলে সাঁইজির জাতহীন মানব দর্শনের ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ এই শ্লোগানকে বাস্তবায়নে সদা সত্য ও সঠিক পথে চলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখতে হবে। দোল পূর্ণিমার তিথিতে মরমী সাধক ফকির লালন শাহের স্ম ণোৎসবে যোগ দিতে আসা বাউল,সাধুরা ইতিমধ্যেই আত্মিক প্রশান্তি নিয়ে লালনভক্ত ও অনুসারীরা ছেঁউড়িয়া লালনের আখড়াবাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন। ফকির লালন শাহের স্মরণে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও অনুসারীদের পদচারণায় মুখর ছিল লালন আখড়াবাড়ি। ফকির লালন শাহের মাজারে এবারের দোল পূর্ণিমায় আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন দেশের অসংখ্য বাউল। উৎসব শেষে আত্মিক বাসনা পূর্ণ করে ফেরার সময় লালন মাজারের প্রধান খাদেম অশ্র“সিক্ত নয়নে বিদায় জানান ভক্ত ও অনুসারীদের।
লালনের জীবন-কর্ম, জাতহীন মানব দর্শন, মরমি সংগীত চেতনার আদর্শের বিষয়গুলো নিয়েই এবারে দেশ-বিদেশের ভক্ত অনুসারীরা মিলিত হয়েছিলেন লালন আখড়ায়। আর এ উৎসবকে ঘিরে কালী নদীর তীরবর্তী বিশাল মাঠে বসানো হয়েছিল লালন মেলা। উৎসবকে ঘিরে পুরো একাডেমি চত্ত্বরে খন্ড-খন্ড স্থানে গান পরিবেশনের সময় দর্শক-শ্রোতারাও নেচে-গেয়ে গানের সাথে সাথে তাল দেয়।
ভাঙলো সাধুর হাট

দোল পূর্ণিমার তিথিতে মরমী সাধক ফকির লালন শাহের স্মরণে কুষ্টিয়া লালন একাডেমি আয়োজিত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সব ও লালন মেলা শেষ হয়েছে গতকাল বুধবার। ইতিমধ্যেই আত্মিক প্রশান্তি নিয়ে লালনভক্ত ও অনুসারীরা ছেঁউড়িয়া লালনের আখড়াবাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন।
ফকির লালন শাহের স্মরণে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও অনুসারীদের পদচারণায় মুখর ছিল লালন আখড়া বাড়ি। ফকির লালন শাহের মাজারে এবারের দোল পূর্ণিমায় আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন দেশের অসংখ্য বাউল। উৎসব শেষে আত্মিক বাসনা পূর্ণ করে ফেরার সময় লালন মাজারের প্রধান খাদেম অশ্র“সিক্ত নয়নে বিদায় জানান ভক্ত ও অনুসারীদের।
লালনের জীবন-কর্ম, জাতহীন মানব দর্শন, মরমি সংগীত চেতনার আদর্শের বিষয়গুলো নিয়েই এবারে দেশ-বিদেশের ভক্ত অনুসারীরা মিলিত হয়েছিলেন লালন আখড়ায়। আর এ উৎসবকে ঘিরে কালী নদীর তীরবর্তী বিশাল মাঠে বসানো হয়েছিল লালন মেলা।
সমাজের ধর্মান্ধ গোড়ামী শাসকদের পক্ষপাত বিচার বৈষম্য দূর করতে ফকির লালন সাঁই তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে গ্রহণযোগ্য জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থার দিক দর্শন দেখিয়েছেন।
সকল ধর্মের উর্ধ্বে থেকে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। তাঁর মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউল গান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে তাঁকে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগী মানুষ লালনকে চিনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করবেন চিরদিন। একদিন বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে অনুষ্ঠিত স্মরণোৎসব কুষ্টিয়ার এই আখড়াবাড়ী ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাবে সেই প্রত্যাশাই কেবল লালন ভক্ত ও অনুসারীদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দার্শনিকে মাষ্টার্স করা ফকির হৃদয় সাঁই বলেন, সত্যিকার অর্থে লালন অনুসারীরা দোল পূর্ণিমার এ রাতটির জন্য সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। সাঁইজির রীতি অনুসারে দোলপুর্ণিমার রাতের বিকেলে অধিবাসের মধ্য দিয়ে ২৪ ঘণ্টার দোলসঙ্গ শুরু হয়। চৈত্রের পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নার ছটায় আর মাতাল হাওয়ায় গানে গানে বাউল সাধকরা হারিয়ে যায় ভিন্ন কোনো জগতে। পরের দিন চারটায় ‘পুণ্যসেবা’ দিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ করে আখড়াবাড়ি ত্যাগ করে থাকে বেশির ভাগ সাধু।
প্রকৃত সাধুসঙ্গের অধিবাস শেষ হলেও লালন একাডেমি আয়োজিত মূল মঞ্চে লালনগীতি ও লালনমেলা চলে আরও চার দিন। তিনি আরও বলেন, মানবধর্মই বড় ধর্ম। একসাথে এভাবে সাধুসঙ্গ করলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সাধু-গুরুর কৃপা ছাড়া মানুষ মুক্তি পেতে পারে না। তার কৃপায় মানুষ সঠিক পথ দেখে। লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান খান চৌধুরী মুকুল বলেন, “লালন স্মরণোৎসব শেষ হচ্ছে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে। এবারের এই লালন স্মরণোৎসব সফল করতে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগ্রহণ করতে পেরে আয়োজকরা অত্যন্ত আনন্দিত।”
উলেখ্য, ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই ফকির লালন শাহর আবির্ভাব ঘটে কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, লালন ফকির ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। যৌবনকালে পূণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে একজন মুসলমানের দয়া ও আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর তিনি সাধক ফকির হন। তার স্মরণে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া লালন মাজার চত্বরে উৎসবের আয়োজন করা হয়।




