গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টি ও উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি এবং নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ঝিনাইগাতীর মহারশি নদীর বিভিন্ন জায়গায় বাধ ভেঙে ও নদীর পাড় উপচে উপজেলা সদর বাজারসহ বিভিন্ন রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। পানির স্রোতে ভেসে গেছে বেশ কিছু বাড়ি-ঘর। এছাড়া নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদীর বাধ ভেঙে এলাকায় পানি প্রবেশ শুরু করেছে। এতে দুই উপজেলার অন্তত শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ।

জানা গেছে, প্রতিবছরই উজানের ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত হয় শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজারসহ নিম্নাঞ্চল। টানা বৃষ্টি আর উজানের পানিতে শুক্রবার ভোররাত থেকেই পানি বাড়া শুরু হয়। এতে ঝিনাইগাতী উপজেলার রামেরকুড়া ও খৈলকুড়া ব্রিজপাড় এলাকায় মহারশি নদীর বাধ ভেঙে পানি প্রবেশ শুরু করে। এতে বেশ কিছু বাড়িঘর পানিতে ভেসে গেছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৫২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং ভোগাই নদীর পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একইসাথে ঝিনাইগাতীর মহারশি নদীর অন্তত পাঁচ জায়গায় বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। ডুবে গেছে আমন ধানের আবাদ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এ নিয়ে চলতি বছর দুই দফায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন ঝিনাইগাতী উপজেলাবাসী। প্রতি বছর এমন পাহাড়ি ঢলের ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ চান স্থানীয়রা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলমান পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে ঝিনাইগাতী উপজেলার অন্তত সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি এবং পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে। ঢল অব্যাহত থাকলে জেলার আমন আবাদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ঢলের পানিতে নালিতাবাড়ী পৌর শহরের নিম্নাঞ্চল, শিমুলতলা, ঘাকপাড়া, মন্ডলিয়াপাড়া ভজপাড়া ও সন্নাসীভিটা, বাতকুচি এলাকায় ভোগাই এবং চেল্লাখালীর বাঁধ ভেঙেছে। নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে শেরপুর-নালিতাবাড়ী ভায়া গাজীরখামার সড়ক। রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয়রা। বাড়ি ঘরে পানি উঠায় রান্না করতে পারছেন না এসব এলাকার লোকজন। ফলে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজারের ব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢলের পানিতে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। মহারশি নদীর বাধ দুর্বল হওয়ায় বাধ ভেঙে বাজারসহ নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে। আমরা দ্রুত এই নদীতে বেড়িবাধ চাই। ঝিনাইগাতীর শাহজাহান আলী বলেন, এর আগে এরকম পানি দেখি নাই। আমাদের বাড়ি ঘরে পানি। রান্না করতে পারছিনা। রাস্তায় পানি ওঠায় চলাচলও করতে পারছিনা। খুব কষ্টে আছি। ঝিনাইগাতী বাজারের ব্যবসায়ী মো. আবু বকর বলেন, আমাদের দোকানপাটে পানি ওঠেছে। অনেক ব্যবসায়ীরই ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছরই নদীর বাঁধ ভাঙ্গে আর আমাদের ক্ষতি হয়। কেউ এদিকে দেখে না। নদীর স্থায়ী বাঁধ চাই আমরা। কৃষক ফজলু মিয়া জানান, আমাদের সব ফসল পানির নীচে। এই ধান এহন খাইয়া গেলেগা আমরা বাচমু কেমনে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন দিলদার জানান, এ বছর ঝিনাইগাতীতে সাড়ে চৌদ্দ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ও সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির আমন ধানের আবাদ আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে। দ্রুত পানি নেমে না গেলে অনেক ক্ষতি হবে।
এদিকে মহারশি নদীতে একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ফিজিবিলিটি প্রস্তাবনা উর্ধ্বতন মহলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীমো. নকিবুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙনকবলিত বাধের জায়গা দ্রুত মেরামতে কাজ শুরু হবে। আর বাধের স্থায়ী সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।




