জামালপুর প্রতিনিধি : ৮ ডিসেম্বর জামালপুরের মেলান্দহ হানাদার মুক্ত দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও সন্তান কমান্ড, প্রশাসন, রাজনীতিক, সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারি, বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ অংশ গ্রহণ করবেন। ১৯৭১ সালের এই দিন বিকেলে আলম কোম্পানীর টু-আইসি (পরবর্তীতে সেঙ্গাপাড়া কোম্পানী) কমান্ডার আব্দুল করিম; উমির উদ্দিন পাইলট হাই স্কুল মাঠে প্রথম পতাকা উত্তোলন করে মেলান্দহকে শত্র“মুক্ত ঘোষণা করেন।
৭১’র এই দিনে তৎকালীন মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জোনাব আলী তার সঙ্গীয় ফোর্স, আব্দুল হক আকন্দ, নুরুর রহমান সরকার, গিয়াস উদ্দিন, আব্দুল্লাহ মৌলানা, আব্দুল গেনা, করিম ভেদা, আব্দুল লতিফ, মোহাম্মদ আলী, শমসের আলী, শহিদুল্লাহ, হাশেম, পিস্তলসহ মোট ৪৬জন রাজাকার আত্মসমর্পন করে।
বীরমুক্তিযোদ্ধা কুলিয়ার আব্দুল জলিল, বালুআটার মজিবুর রহমান হেলাল, মালঞ্চ’র মোহাম্মদ আলী মিয়ার উদ্দিন, আব্দুর রহিম, আব্দুল জলিল, গিয়াস উদ্দিন, আজিজুল হক পুলিশ, রোকনাইয়ের আব্দুর রহিম, আব্দুর রশিদ মেম্বার, দুরমুঠের আবুল মনসুর, নাংলার ইউসুফ আলী, আ: রাজ্জাক, তেঘরিয়ার মাহবুবুর রহমান, আব্দুল আজিজ, দেওলাবাড়ির আব্দুর রহিম, রোকনাইয়ের রেজাউল করিম, শহিদ আব্দুল কদ্দুস, তৈয়বুর রহমান, ইসলামপুরের আসর উদ্দিন, রেজাউল করিম, মাদারগঞ্জের আবু বকর, সালাউদ্দিন, এডভোকেট গোলাম নবী, রেজাউল করিম, মহিষবাথানের আ:সোবহান, ভাঙ্গুনী ডাঙ্গার আবু সাইদ মাষ্টার, মহিরামকুলের ইসহাক, আব্দুল জলিল, চরগোবিন্দির হাজী আব্দুল খালেক, আদ্রার গোলাম মোস্তফা, জয়নাল আবেদিন, ঢালুয়াবাড়ির আবেদ আলী, বেলতৈলের কামাল হোসেন ছাড়াও নান্দিনা, শেরপুর ও গফরগাঁও এলাকার নাম অজানা প্রায় অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
মেলান্দহ উপজেলায় পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে মুক্তিবাহিনীদের দু’টি সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্র ছিল। একটি হলো মেলান্দহ সদর। অপরটি হলো মাহমুদপুর পয়লা ব্রিজ। মাহমুদপুর যুদ্ধক্ষেত্রে করিম কমান্ডারের সহযোদ্ধা ইউসুফ আলীর ব্রাশ ফায়ার করে ১২জন পাক সেনাকে হত্যা করেন। এসময় তেঘরিয়া-সিরিঘাটের রমিজ, নাম অজানা আরেক মুক্তিসেনাসহ ১০/১২জন লোক নিহত এবং অপর যোদ্ধা কলাবাধা হাই স্কুলের ছাত্র আব্দুল কদ্দুস পাকবাহিনীর হাতে আটক হন। সেখান থেকে শহিদ সমরও পাকবাহিনীর হাতে আটক হন। এরপর তার কোন খবর পাওয়া যায়নি। পাকবাহিনীরা কদ্দুসকে ইসলামপুরে নিয়ে জুতোর মালা পরিয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান দিতে নির্যাতন চালায়। এরপর তাকে জামালপুর কালিরঘাটে নিয়ে হত্যা করা হয়। পাকসেনারা এসময় করিম কমান্ডারের বাড়ি-ঘরসহ মেলান্দহের অসংখ্য বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয় । তৎকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এখবরটি সম্প্রচারিত হয়।
যুদ্ধে কোনামালঞ্চ’র আমানুল্লাহ কবির, আদিপৈতের সমর উদ্দিন, শাহাজাদপুরের নুরুল ইসলাম, চরগোবিন্দির শাহজাহান, রোকনাইয়ের আব্দুল কদ্দুস, বীর ঘোষেরপাড়ার জয়েন উদ্দিন এবং কাহেতপাড়ার নুরুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধা ও মেলান্দহবাসির প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানাযায়-তৎকালীন ঝুপড়ি এলাকা-বর্তমান মেলান্দহ উপজেলা পরিষদ চত্বরের মধ্যে (গণকবর বা বধ্যভূমি) এক নিচু জায়গায় অনেক লোককে নির্যাতন শেষে শাহজাতপুরের আব্দুল বারেক, দিঘলবাড়ির বাচ্চু মিয়া, বারই পাড়ার গৌর গোপাল, আদিপৈতের গোপাল ডাক্তার, কাজিরপাড়ার লুৎফর রহমান লেবুসহ নাম অজানা অনেকেই গণকবরে পূতে রাখা হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মেলান্দহ সীমান্তে ৩টি হানাদার ক্যাম্প ছিল। এ ক্যাম্প ৩টি জামালপুর-মেলান্দহ সীমান্তে ঝিনাই ব্রিজ, নলেরচর, বেতমারী, সাধুপুর, বানিপাকুরিয়া ও দাগী এলাকার ৭ ও ৮নং রেলওয়ে ব্রিজ। পাকবাহিনীর ক্যাম্পদ্বয় বানিপাকুরিয়া গ্রামের সাথে অবস্থিত থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশুসহ সবচে’ বেশী মানুষ নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে। যুদ্ধচলাকালে পাকবাহিনীরা শাহ্ জামাল নামের এক অবুঝ শিশুকে মায়ের কুল থেকে ক্যাম্পে নিয়ে পাথরে নিক্ষেপ করে। এতে শিশুটির মাতা, দাদী, ও বড়বোন অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মুমূর্ষু অবস্থায় জালাল উদ্দিন শিশুকে উদ্বার করে মায়ের কুলে পৌঁছে দেন। দুর্ভাগ্যবশত: ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে শিশুর দাদী-বোন মারা গেছেন। হৃদয় বিদারক বিষয় হলো-কাফনের কাপড়ের অভাবে কাঁথায় জড়িয়ে মৃতদ্বয়ের দাফন করা হয়। মুক্তিসেনাসহ সাধারণ লোকদের ধরে নিয়ে এই টর্চার সেলগুলোতে নির্যাতনসহ বহুলোকদের হত্যা করে।
একই সময়ে বানিপাকুরিয়ার সামাদ ডাক্তারসহ বেশ ক’টি বাড়ি-ঘর পুড়ে দেয়। বানিপাকুরিয়ার অছিমদ্দিন, ওই শিশুটির পিতা ওমর আলী, চাচা সৈবালি এবং কারী আ:ওয়াহাব, নিহন আলী, ডা: আব্দুস সামাদ মন্ডল দাগী গ্রামের নবীন মোল্লা মটর পাগলা, দু’সহোদর, আনোয়ার হোসেন আনার পাগলা, আ: আজিজ, বেতমারী গ্রামের নজি মেম্বারসহ অনেক লোকদের পাকসেনা ক্যাম্পে (টর্চার সেল) নির্যাতন করে।
ফলে এ এলাকার বিক্ষুব্দ মানুষের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ফারাজির নেতৃত্বে পাকসেনা ক্যাম্পে গ্রেনেড হামলা চালায়। পাকসেনাদের সুচনীয় পরাজয়ের কাহিনী আজো এলাকাবাসির মুখে মুখে। পাকবাহিনীর এই ক্যাম্পগুলোতে বহু নারীর সতীত্ব হনন, বহুলোকের প্রাণহানি, নির্মম নির্যাতনের কান্নার স্মৃতি শুনলে আজো গা শিউরে ওঠে।
ওই সময় পাক-হানাদাররা কয়েক মহিলাকে টর্চার সেলে ধরে নিতে ব্যর্থ হয়ে পরিহিত গয়না ছিড়ে নেয়ার ছলে আহত করে। সুযোগ সন্ধানী রাজাকার-আলবদরের দোষররা এই এলাকার জনৈক নারীর সমভ্রম কেড়ে নেয়ার কাহিনী আজো বাতাস ভারী করে। লোক লজ্জার ভয়ে নির্যাতিত জনৈকা নারীটি এখনো এলাকা ছাড়া। বর্তমানে নি:স্ব অবস্থায় নারীটি ঢাকায় আত্মগোপনে আছেন।
মেলান্দহ মুক্তিযোদ্বা সংসদের সাবেক কমান্ডার আলহাজ এসএম আব্দুল মান্নান শহীদ মুক্তিযোদ্বাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলেন-কমান্ডার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০১০ সাল থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপনের প্রবর্তন করি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনা উজ্জীবিত হয়ে সকল শহিদ মুক্তিযোদ্বাদের নামে রাস্তাÑঘাট ও প্রতিষ্ঠান করার, গণকবর রক্ষায় একটি অত্যাধুনিক স্মৃতি স্তম্ভ স্থাপন, মেলান্দহ রেলস্টেশনের শিমুল তলী থেকে মাহমুদপুর পর্যন্ত শহীদ সমরের নামে রাস্তার নামকরণের দাবী করছি।
সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্বা সংসদের কমান্ডার সরকার আব্দুস সালাম বকুল জানান- স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা টাকা, স্বর্ণ-গয়না পিছনে ফেলে সুদর্শন নারীকেও মায়ের মর্যাদা দিয়ে রক্ষা করেছে। বর্তমানে স্বাধীন বাংলা হলেও এই চেতনার মানুষের অভাব। অপরাজনীতির জাঁতা কলে মুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধুলিস্যাত হচ্ছে। প্রকৃত যোদ্ধারা হচ্ছেন বঞ্চিত। অমুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে বাধাগ্রস্থ্য। এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
শত্র“মুক্ত দিবসে বিজয় পতাকা উত্তোলনকারী সাবেক উপজেলা কমান্ডার আব্দুল করিম জানান-স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী হয়েই বীর দর্পে যুদ্ব করেছি। যতই দিন যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বাড়ছে। ক্ষমতাসীনরা বার বার মুক্তিযোদ্ধাদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার ফলেই স্বাধীনতার চেতনা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। দেশ-জাতীর শান্তি-স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যের বিকল্প নেই।
সাবেক কমান্ডার আনোয়ার হোসেন মাষ্টার জানান-এই দিনে জাতী-ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকল শহিদ পরিবারকে সমবেদনা, মুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিকামী জনতা এবং শত্র“মুক্ত দিবসে অংশ গ্রহণকারী সবাইকে মেলান্দহবাসির বিজয় শুভেচ্ছা। মুক্তিযোদ্ধাদের সকল দাবী পূরণ হোক এ প্রত্যাশাই করছি। লেখক-সভাপতি মেলান্দহ রিপোর্টার্স ইউনিটি-মানবাধিকার কর্মী, জামালপুর।




