জাতীয় সংসদে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের রূপরেখা তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। এই বর্ধিত চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকার অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংসদ সদস্যের এক সময়োপযোগী প্রশ্নের জবাবে তিনি জাতীয় সংসদে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ ও নীতিমালার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল-এর সভাপতিত্বে হেলেন জেরিন খান এর উত্থাপিত নোটিশের জবাবে এসব কথা বলেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলপত্র অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ুদূষণহীন অন্যান্য প্রযুক্তি যেমন বায়ু, বর্জ্য, পানি, ভাসমান সোলার ও এগ্রি-ভোল্টাইকস থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকার বাজেটে বিশেষ শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করেছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ কর নিরূপণ করা হয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিতে সরকার ক্ষুদ্র ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের বড় ধরনের সুবিধা দিচ্ছে।

মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগামী ৬ মাসের জন্য পূর্ণ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত আমদানি করা যন্ত্রাংশে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, সংযোজন কর, আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর পুরোপুরি মওকুফ থাকবে।
আগামী গ্রীষ্মের আগেই এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে সরকার আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন, তাদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরকার আকর্ষণীয় ১০.৫০ টাকা হারে কিনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করবে। এই খাতকে সুসংগঠিত করতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে সরকারি জমিতে প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা ২০২৬ এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা ২০২৫ জারি করা হয়েছে।
এছাড়া নেট মিটারিং গাইডলাইন, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট বিজনেস মডেল চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হুইলিং চার্জ ও ক্রস সাবসিডি চার্জের বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের কাজ চলছে।
আগের অবস্থান পরিবর্তন করে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প গ্রহণের কথা তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের বদলে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অব্যবহৃত অ্যাশ পন্ড এলাকায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মস্থান ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর উপলক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২৩টি ভবনের ছাদে বিদ্যুৎ বিভাগের সহায়তায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে, যা আগামী ১৭ তারিখে উদ্বোধন করা হবে।
জাতীয় সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের একটি দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদের কোনো কার্যক্রমে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হবে না। সমগ্র সংসদ ভবনকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই পদক্ষেপ কেবল বৈশ্বিক মুদ্রার অপচয়ই কমাবে না, বরং দেশে নতুন নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি করবে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
বক্তব্য শেষে মাননীয় স্পিকার তাকে ধন্যবাদ জানান এবং সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানকে সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ প্রদান করেন।




