ads

বুধবার , ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

রফিকুল ইসলাম আধার-এর ছোটগল্প ‘প্রশান্তির জল’

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক - ফটো কার্ড
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

সুখের প্রাচুর্যে ঘেরা আনিস রহমানের সংসারে অর্নব রহমান শস্য যেন সোনার চামচ মুখে নিয়ে বেড়ে ওঠা এক রাজপুত্র। বাবার প্রবল ইচ্ছায় ডাক্তারি পড়া হয়নি, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে গত বছরই এমএজি শেষ করেছে সে। শত একর মাছের ঘের আর শিল্পকারখানার বিশাল সাম্রাজ্যে শস্যকে বসানোর প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত, তখনই সে মায়ের কাছে মেলে ধরে নিজের হৃদয়ের গোপন কথাটি—অর্পিতা হালদারের কথা।
অর্পিতা—ভিকারুননিসা থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করা এক শান্ত, রূপসী তরুণী। কিন্তু বাধ সাধল তার পরিচয়। সে মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং সনাতন ধর্মের। মা লিলি রহমান ছেলেধনের খুশির জন্য রাজি হলেও স্বামী আনিস রহমানের সামনে কথাটা পাড়তেই যেন ঘরে আগুন জ্বলল।
কন্যা নেলিকে পাশে নিয়ে লিলি রহমান যখন প্রস্তাবটা রাখলেন, আনিস রহমান গর্জে উঠলেনÑ‘যেটা কোনোদিন সম্ভব নয়, তা নিয়ে ভাবার কোনো কারণ নেই! এরপরেও ওই মেয়েকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তোমরা আমার মরা মুখ দেখবে!’

Shamol Bangla Ads

বাবার এমন কঠিন ও অনমনীয় অবস্থানের সামনে নিভে গেল শস্যের সব আশা। খবরটা পেয়ে পিতা-মাতাহীন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা অর্পিতার আকাশটাও ভেঙে পড়ল। তবে ভেঙে পড়ার মাঝেও সে শস্যকে সান্ত্বনা দিল, ‘দরকার হলে আমি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে তোমার মর্যাদা রাখব, শস্য। তুমি ভেঙে পড়ো না।’
কিন্তু শস্যের সিদ্ধান্তহীনতা আর বাবার কঠিন দেয়াল তাকে ভেতরে ভেতরে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল। মানসিক যন্ত্রণা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। প্রথমে ময়মনসিংহে চিকিৎসা, তারপর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার এক বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে ভর্তি করা হলো শস্যকে। নানাবিধ পরীক্ষার পর ডাক্তার গম্ভীর মুখে জানালেনÑশস্যের একটি কিডনি পুরোপুরি অকেজো, অন্যটি ৫০ শতাংশ বিকল। দ্রুত ডোনার না পেলে তাকে বাঁচানো অসম্ভব।
পত্রিকায় গোপন বিজ্ঞাপন গেল, কিন্তু সময় বয়ে যেতে লাগল। অর্থের বিনিময়েও মিলল না কোনো উপযুক্ত ডোনার। খবরটি অর্পিতার কানে পৌঁছাতেই তার পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল। টাকার বিনিময়ে যখন জীবন মিলছে না, তখন সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। গোপনে যোগাযোগ করল শস্যের চিকিৎসকের সঙ্গে। ‘আমি কিডনি দেব ডাক্তারবাবু। কিন্তু একটা শর্ত—আমার পরিচয় শস্য বা তার পরিবার কোনোদিন জানতে পারবে না।’

অপারেশন সফল হলো। চার সপ্তাহ পর শস্য সুস্থ হয়ে ওঠার পর যখন হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার মন জুড়ে কেবল এক অজানা শূন্যতা আর অস্বস্তি। চারপাশের অতুল বিত্ত আর স্বজনদের ভিড়েও তার মনে হচ্ছিল, সে তো অন্য কারও ঋণে বেঁচে আছে!
হাসপাতাল ত্যাগের শেষ মুহূর্তে শস্য ডাক্তার দিবাকর ভৌমিককে চেপে ধরলÑ‘ডাক্তারবাবু, যে মানুষটা আমাকে জীবন দিল, তার নামটা অন্তত আমাকে বলবেন না?’
ডাক্তারবাবু হাসলেন। ‘তিনি নাম প্রকাশ করতে মানা করেছেন শস্য। তবে এটুকু বলি, তিনি এক নারী। এখনও এই হাসপাতালেই আছেন, নবম তলার ক্যাবিনে। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাঁকে, আজকালের মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হবে।’

Shamol Bangla Ads

শস্যের অস্থিরতা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল মা লিলি রহমান, বোন নেলি আর বাবা আনিস রহমানের মধ্যেও। অজ্ঞাত সেই মহীয়সী নারীকে একনজর দেখতে সবাই ছুটল নবম তলার ক্যাবিনে।
ক্যাবিন নম্বর ৯০৪-এর দরজাটা আলতো করে খুলতেই চারজোড়া চোখ আটকে গেল বেডে শুয়ে থাকা এক তন্বী তরুণীর ওপর। চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটি অন্য কেউ নয়Ñঅর্পিতা!
সবাই চমকে উঠল। শস্যের পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। কদম ফুলের মতো ফ্যাকাশে মুখে চোখ মেলল অর্পিতা। শস্য শিউরে উঠে বলল, ‘অর্পিতা? তুমি… তুমি এখানে? নিজের জীবন বাজি রেখে এ কাজ করতে গেলে কেন?’
অর্পিতা ঠোঁটে একফালি মলিন হাসি এনে বলল, ‘যে জীবন তোমার কাজে লাগল না, সেই জীবনের আবার মূল্য কী শস্য? তুমি বেঁচে আছো, এর চেয়ে বড় পাওনা আমার আর কী হতে পারে?’
‘কিন্তু আমি যে তোমাকে কোনো মর্যাদা দিতে পারিনি অর্পিতা…’ শস্যের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
‘তুমি বেঁচে না থাকলে আমার বেঁচে থাকারও কোনো অর্থ থাকত না। তোমার শরীরে আমার অংশটুকু বেঁচে থাক, এটুকুই আমার পরম শান্তি।’

ক্যাবিন জুড়ে তখন থমথমে নীরবতা। শস্য ধীরে ধীরে তার বাবার দিকে তাকাল। যে আনিস রহমান অহংকারের চাদরে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন, আজ তাঁর দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নীরব অশ্রু। টাকার পাহাড় আর বিত্তের জৌলুস এক নিঃশ্বাসে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে এই মেয়েটির ভালোবাসার সামনে।
শস্য বিনীত স্বরে শুধাল, ‘এখনও কি তুমি চুপ করে থাকবে, বাবা?’
আনিস রহমান অর্পিতার শয্যার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। ধিক্কারে ভারী হয়ে এলো তাঁর গলাÑ‘অর্থের অন্ধ মোহে আমি বুঝতে পারিনি যে, পৃথিবীতে এখনও সত্যি ভালোবাসা বেঁচে আছে। আর সেই ভালোবাসার কাছে ধর্ম কিংবা আভিজাত্য নিতান্তই তুচ্ছ!’
মা লিলি রহমান আর বোন নেলি এগিয়ে এসে অর্পিতার মাথায় হাত রাখলেন।
নেলি অর্পিতার হাত দুটো ধরে বলল, ‘বিনিময়ে কিছু না চেয়ে এত বড় উপহার দিলেন আপা, এবার আমাদেরও তো কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার আছে।’
অর্পিতা ব্যাকুল হয়ে বলল, ‘না না, বোন! আপনারা ভুল বুঝবেন না। আপনাদের মুখে হাসি ফুটেছে, শস্য সুস্থ হয়েছে—আমার প্রাপ্তি এটুকুই। সম্পর্কের স্বীকৃতি না পেলেও আমি অনুযোগ করব না।’
‘না মা, তা হয় না,’ আনিস রহমান বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি নিজের তথ্য গোপন রেখে আমাদের যে আলো দেখালে, তাতে আমাদের অন্ধ চোখ খুলে গেছে। তুমি শুধু শস্যকে জীবন দাওনি, আমাদের পুরো পরিবারকে বাঁচিয়েছ। তোমাকে ছাড়ার কথা আমরা ভাবতেও পারি না।’
কথাটি বলেই আনিস রহমান শস্যকে টেনে অর্পিতার বেডের পাশে বসিয়ে দিলেন।

মা লিলি রহমান পরম মমতায় শস্যের ডান হাতটি এনে অর্পিতার হাতের ওপর রাখলেন। আনিস রহমান নিজের দু’হাত দিয়ে সেই দুটি হাত ঢেকে দিয়ে আশীর্বাদ করলেন।
বাইরে তখন বিকেলের সোনাঝরা রোদ কাঁচের জানালা টপকে এসে পড়েছে তাঁদের ওপর। আর সেই ক্যাবিনের ভেতরে, অহংকার আর অনুতাপের সমীকরণ মিটে গিয়ে, সবার চোখ থেকেই গড়িয়ে পড়ছিল একপশলা পরম ‘প্রশান্তির জল’।

লেখক : কবি, লেখক ও গীতিকার।

Need Ads