দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার একজন দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী রাজনীতিক ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় শ্রদ্ধেয় মতি ভাইয়ের অভিভাবকত্বে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়। উপরন্তু তাঁর ও আমার গ্রামের বাড়ি সরিষাবাড়ী হওয়ায় আমি তাঁর পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে যাই এবং তঁাঁর প্রয়াণের পরেও একইভাবে রয়েছি। তাঁর মহীয়সী স্ত্রী, আমাদের মাতৃতুল্য ভাবী মনোয়ারা বেগম মনু, জ্যেষ্ঠপুত্র এ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান তালুকদার মিন্টু (বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি), আরেক পুত্র ডা. মোহাম্মদ মুরাদ হাসান (বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী) ও একমাত্র কন্যা মমতাজ জাহান দ্বিজু- সকলের সঙ্গে আমার, এবং আমার পরিবারের সম্পর্ক অটুট রয়েছে। প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাসভারি মানুষ ছিলেন মতি ভাই। তাঁর বুকভরা স্নেহ ও ভালবাসা ছিল। আমরা ছাত্রলীগ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়য়ের ছাত্রাবস্থায় দলের কাজে জামালপুর গেলে তাঁর বাড়িতে থাকতে হয়েছে। চেষ্টা করেও অন্য কোথাও থাকতে পারিনি। তিনি সব সময় পাশে বসিয়ে খাওয়াতেন। নেতা-কর্মীদের প্রতি তাঁর এমন ভালবাসার কথা, স্নেহ-মমতার কথা আজকের দিনে কল্পনা করাও কঠিন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখাপড়া ও ভাল ছাত্রদের প্রতি মতি ভাইয়ের খুব আগ্রহ ছিল। আমি মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেলে তিনি আমাকে জামালপুরে সংবর্ধনা দিতে চেয়েছিলেন। একজন আইনজীবী হিসেবে তাঁর মহত্তে¡র কথা উল্লেখ না-করলেই নয়। তিনি প্রথমে একজন মক্কেলের কথা শুনতেন। কথা শোনার পর মামলায় জেতার সম্ভাবনা না থাকলে বলতেন- ‘গ্রামে গিয়ে পারলে আপোস রফা করে ফেলেন। এই মকদ্দমায় আপনি জিততে পারবেন না। বাংলাদেশে এমন কোন উকিল নেই যিনি আপনাকে এই মামলায় জিতায়।’ তারপর মহুরিকে বলতেন- ‘টাকাটা ফেরৎ দিয়ে দাও।’ একজন আইনজীবী এত সততার সঙ্গে এভাবে ওকালতি করতে পারেন, মফস্বল শহরে, মহকুমা শহরে, জেলা শহরে এমন মহৎ আইনজীবীর কথা কখনও শুনিনি। অন্যদিকে সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়ার দুঃশাসনকালে বিনা ফি-তে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা অসংখ্য হয়রানিমূলক মামলা পরিচালনা করেছেন।
এ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার একজন প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। আমরা কখনও তাঁর মুখ থেকে শুনিনি যে, তিনি আশেক মাহমুদ কলেজের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। এটা আমাদের কারও জানা ছিল না। একজন মানুষকে জানতে হলে তার সম্পর্কে তথ্যগুলো জানতে হয়; তিনি কি কি কাজ করেছেন সেগুলো জানতে হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। একজন আইনজ্ঞ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সীমান্তের ওপারে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছেন। পঁচাত্তরের পরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করার জন্য তাঁকে কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে মতি ভাই প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছিলেন। তখনকার দিনে সরিষাবাড়ীর পশ্চিম অঞ্চলে দুর্গম বালুচরে পায়ে হেঁটে হেঁটে, মঞ্চে হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় রাতের জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আস্থাভাজন।

তিনি জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির ছয়বার নির্বাচিত সভাপতি এবং জাতীয় আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি ছিলেন। জামালপুরে একটি আইন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন আইন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে। এগুলো হচ্ছে মানব সমাজের জন্য তাঁর বড় ধরনের কাজ, যা আমাদের জামালপুর অঞ্চলের অনেক মানুষই জানেন না। দরিদ্র মানুষের জন্য তিনি আজীবন কাজ করেছেন। অন্ধকল্যাণ সমিতির তিনি সভাপতি ছিলেন। এলাকায় সাধারণ মানুষের, গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে ত্রাণ দেয়ার জন্য, খাদ্য সহায়তা দেয়ার জন্য, ওষুধ দেয়ার জন্য তিনি রেড ক্রিসেন্টের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আজকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক কর্মীদের, রাজনৈতিক নেতাদের মর্যাদা যেভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সেই তুলনায় মতিয়র রহমান তালুকদার ছিলেন একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ আজ আমাদের জন্য অনুকরণীয়।
ভারতের এপিজে আবদুল কালাম ও পাকিস্তানের আবদুল কাদির পারমাণু বোমা তৈরি করেছেন। সেই বোমা বিস্ফোরণের অথবা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে। তেমনিভাবে মানুষের কল্যাণে ওষুধ বা আজকে করোনা মহামারীকালে বিজ্ঞানীরা যে কয়েকটি টিকা আবিষ্কার করেছেন সেগুলো ব্যবহার রাজনীতিবিদরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন। সুতরাং, সেই রাজনীতিবিদরা যদি শুদ্ধ না হন, তাঁরা যদি চরিত্রবান না হন, তাঁদের যদি নৈতিকতা না থাকে, তাঁরা যদি অর্থ-বিত্তের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করেন তবে এসব গুরু দায়িত্ব পালন করবেন কিভাবে? তাদের চিন্তা করতে হবে, জীবন একটাই এবং আমার মৃত্যু আছে। আমাকেও মতিয়র রহমান তালুকদারের মতো এরকম কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করে মানুষের জন্য কিছু করে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য অনুসারী মতিয়র রহমান তালুকদার রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। ক্ষমতার লোভে, আত্মস্বার্থে কখনও আপোস করেননি। জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশের দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর সেই মহানুভবতার জন্যেই আজ তাঁর মহৎ কর্মযজ্ঞ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমরা যদি এই মহৎ রাজনৈতিক নেতাদের পথ অনুসরণ করে জনগণনন্দিত নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাজনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি তাহলে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। আমি প্রয়াত নেতা এ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারের স্মৃৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।




