করোনা মহামারী আর সরকারঘোষিত চলমান লকডাউনের কারণে খেয়ে না খেয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে শেরপুরে বসবাসরত ভাসমান বেদেপল্লীর বাসিন্দারা। লকডাউনে কাজে বের হতে না পারায় অলস সময় কাটাতে হচ্ছে বেদে পরিবারগুলোকে। এদিকে স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়ায় আর্থিক বা খাদ্য সহযোগিতাও না পেয়ে বেশ বিপাকে রয়েছেন তারা।

জানা গেছে, শেরপুর সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের পাশে বর্তমানে বসবাস করছে বেদেপল্লীর ৪০টি পরিবার। এছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো প্রায় ৬০টি পরিবার। সবমিলিয়ে জেলায় শতাধিক বেদে পরিবারের পুরুষরা বিভিন্ন গ্রামে ও হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে সাপের খেলা, বানরের খেলা ও তাবিজ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতেন। বেদে পরিবারের মেয়েরাও গ্রামে গ্রামে ঘুরে ম্যাজিক খেলা দেখানো, কবিরাজী চিকিৎসা, তাবিজ বিক্রি করে আয় করে থাকেন। পুরুষ মহিলা মিলে যা আয় করেন তা দিয়েই মুটামুটি চলে যায় তাদের সংসার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় সরকারঘোষিত কঠোর লকডাউনের কারণে হাটে-বাজারে এখন সাপের খেলা, বানরের খেলা ও তাবিজ বিক্রি করতে পারছেন না তারা। এতে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেশ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে এ সম্প্রদায়ের মানুষজন।
সরেজমিনে সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের পাশে বসবাসরত বেদে পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া থেকে ঘুরতে ঘুরতে মাসখানেক আগে এখানে ডেরা পেতেছেন তারা। এখানে এসেই লকডাউনে পড়ে গেছেন। তাই কোন কাজ না থাকায় বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন বেদে পল্লীর বাসিন্দারা। বর্তমানে কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে তারা। তাই সরকারের কাছে চান আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা। ওই বেদে পল্লীর সর্দার মো. ফরহাদ হোসেন জানান, ‘আমরা এখানে আসার পর থেকে লকডাউন শুরু হওয়ায় হাটে-বাজারে যেতে পারছি না। খেলাও দেখাতে পারছি না। তাই আমরা খুব কষ্টে আছি।’

বেদেপল্লীর আরেক বাসিন্দা মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‘আমি যশোর থেকে এখানে এসেছি। আমি হাটে হাটে বানরের খেলা দেখিয়ে যা আয় রোজগার করি তাই দিয়ে সংসার চালাতাম। কিন্তু সরকার লকডাউন দেওয়ায় খেলা দেখানো বন্ধ। সরকারি নির্দেশনা তো মানতেই হবে। তাই রোজগারও বন্ধ। এখন খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছি। কেউ তো আমাদের সাহায্যও দেয় না। এখন আমরা চলি কিভাবে?’ বেদেনী রিনা বেগম বিভিন্ন গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ম্যাজিক খেলা দেখাতেন আর কবিরাজী চিকিৎসা করতেন। তিনি জানান, ‘এখন করোনার কারণে আমাদের কেউ বাড়িতেই ঢুকতে দিতে চায় না। তাই কামাই বন্ধ। সরকার তো অনেকেরেই সহযোগিতা করতেছে। কিন্তু আমরা কিছু পাচ্ছি না।’ আরেক বেদেনি হাসি বেগম বলেন, ‘আমাদের দুঃখ দেখার কি কেউ আছে? কতদিন থেকে বেকার বসে আছি, কিন্তু কোন সহযোগিতা পাচ্ছি না। কাজে যেতে না পারলে খাব কি?’
স্থানীয় চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আকবর আলী বলেন, বহু বছর ধরেই এ জায়গায় বেদে পরিবারগুলো বসবাস করে আসছে। একদল চলে গেলে আরেক দল আসে। আমরা এসব বেদে পরিবারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছি। কিন্তু তাদের জন্য কোন বরাদ্দ না থাকায় আর্থিক সহায়তা করতে পারছি না। তবে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা বেদেদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে শেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ফিরোজ আল মামুন জানান, বেদেরা সাধারণত যাযাবর জীবনযাপন করে। যখন যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই স্বল্প সময়ের জন্য বসতি গড়ে। করোনা পরিস্থিতি ও চলমান লকডাউনের কারণে এখন তারা খেলা দেখাতে পারছে না বলে তাদের কষ্ট হচ্ছে বলে আমরা শুনেছি। তাদেরকে খাদ্য সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের তরফ থেকে তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। আশা করছি খুব শিগগিরই তারা সহায়তা পাবেন।




