ads

সোমবার , ৪ জুলাই ২০১৬ | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

পবিত্র ঈদুল ফিতর ॥ উৎসব-ইবাদাত-সাম্য-মৈত্রীর মেলবন্ধন : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

শ্যামলবাংলা ডেস্ক - ফটো কার্ড
জুলাই ৪, ২০১৬ ৪:২৩ অপরাহ্ণ

dr. Abdul Alimপ্রাচীনকাল থেকেই এ বিশ্ব চরাচরের প্রায় প্রতিটি জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। এ সব উৎসবে কোন প্রকার উচুঁ-নীচুর বৈষম্য, ধনী-গরীবের শ্রেনী-বিভেদ, কালো-ধলোর দ্বন্দ্ব সচরাচর তেমন লক্ষ্য করা যায় না তবে ক্ষেত্র বিশেষে এর ব্যাত্যয় যে ঘটে না তা হলফ করে বলা যাবে না। তেমনিভাবে সমগ্র বিশ^জাহানের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে ঈদ হচ্ছে বিশ^ মুসলিমের একটি বার্ষিক সম্মিলন ও উৎসবের দিন। এ বিশেষ দিন মুসলমানদের জীবনে বছরে দু’বার ফিরে আসে। সৌরবছরের এ দু’টি প্রধান উৎসবকে ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় বলা হয় ঈদ। এর একটি ‘ঈদুল ফিতর’, অন্যটি ‘ঈদুল আযহা’। ঈদের দিন বিশ্ব মুসলিম পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে গিয়ে ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, আমীর-ফকীর মিলিতভাবে একই কাতারে দাঁড়িয়ে এ বিশেষ দু’রাকাত ওয়াজিব নামায আদায় করে থাকে। এ নামায আদায়ের উৎকৃষ্ট সময় সূর্যোদয়ের পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত। কেউ বিশেষ কোন কারণে এ নামায আদায় করতে না পারলে এর কোন কাযা আদায় করার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ ঈদের নামাযের কোন কাযা নেই। উম্মাতে মুহাম্মদী (সা.)কে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষ কিছু বরকতময় অনুষ্ঠান প্রদান করেছেন, যা অন্য কোন নবী রাসূলের অনুসারীরা লাভ করেনি। তন্মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা, প্রীতি ও সৌহার্দের এক অনুপম দৃষ্টান্ত প্রদর্শন ও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তায়ালার অনুকম্পা লাভের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান পবিত্র ঈদ।
রমযান মাসের পুরো একমাস সিয়াম সাধনা তথা রোযা পালনের পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে মুসলিম জাহানে যে আনন্দোৎসব উদ্যাপিত হয়ে থাকে তা ‘ঈদুল ফিতর’ নামে অভিহিত। ‘ঈদুল ফিতর’ আরবি ভাষার দু’টি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘ঈদ’ অর্থ খুশী, আনন্দ; আর ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ স্বভাব, উপবাস ভঙ্গকরণ। দীর্ঘ একটি মাস মহান আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ পালনার্থে উপবাস ও সংযম সাধনার পর বিশ^ জাহানের মুসলমানগণ এই দিনে উপবাস ব্রত হতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং এ উপলক্ষে আনন্দোৎসব করে থাকে; এজন্য এ উৎসবের নামকরণ করা হয়েছে ‘ঈদুল ফিতর’ বা স্বাভাবিকতায় প্রত্যাবর্তন বা উপবাসব্রত ভঙ্গের উৎসব।
হযরত রাসূলে কারীম (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পর সেখানে দেখতে পান যে, প্রতি বছর মদীনায় পারসীকদের প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ উৎসব’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান উৎসব’ উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এ দু’টি বিজাতীয় উৎসবের রীতি-নীতি ইসলামী রীতি-নীতির পরিপন্থি ছিল বলে নবী করীম (সা.) মুসলমানদেরকে এতে যোগদান হতে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করেন এবং তদস্থলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা- এই দু’টি উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন।
ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনাদর্শ যার কোন বিধি-বিধান, রীতি-নীতি তথা কোন কার্যাবলীই তাৎপর্যহীন, অকল্যাণকর, অনর্থক ও সাওয়াব শূণ্য নয়। এজন্যই মুসলমানগণ একই সাথে আনন্দোৎসব পালন ও নানা রকম ইবাদাত পালনের মাধ্যমে অশেষ সাওয়াব হাসিল করে থাকে। আল্লাহ্ তায়ালার মহান দরবারে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করার নামই ইসলাম, আর তার তাওহীদ বা একত্বের স্বীকৃতিই ইসলাম ধর্মের মূলকথা। মু’মিন ব্যক্তির আকীদায় আল্লাহ্ তায়ালা সর্বশক্তিমান ও সর্বস্থানে সদা বিরাজমান। এ বিষয়ের আন্তরিক বিশ^াস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং কার্যতঃ এর অনুষ্ঠানাদি- এ ৩টি উপাদানের সমাবেশে ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে। কেবলমাত্র বিশ^াস অথবা শুধুমাত্র মৌখিক স্বীকৃতির ফলে কেউ খাঁটি মু’মিন বা সত্যিকার মুসলমান হতে পারে না। ওই উপাদানত্রয়ের একত্র সমাবেশের মাধ্যমেই প্রকৃত মু’মিন হওয়া যায়। দীর্ঘ এক মাসকাল রোযা পালনের মাধ্যমে মুসলমানগণ বিশ^াসের স্বীকৃতি ও কার্যতঃ প্রমাণ দিয়ে থাকে; তৎসঙ্গে খোদাপ্রীতি, ধর্মনিষ্ঠা, সংযম ও সাধনার পরিচয়ও দিয়ে থাকে। এভাবে ঈদের দিনে মুসলিম জীবনের বিশ^াস ও সাধনার বিজয় ঘোষিত হয়ে থাকে।
ঈদের দিন মুসলিম মিল্লাতের জন্য এক পরম আনন্দ উৎসব ও সামগ্রিক উৎকর্ষ সাধনের দিন। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন,- রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ হলো- ১. রোযা ভঙ্গের সময় অর্থাৎ ইফতারের সময় এবং ২. শেষ বিচারের দিনে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়। পূর্ণ এক মাস সিয়াম সাধনা আর কঠোর সংযম ও কৃচ্ছতা সাধন শেষে রোযাদারের অবস্থা পুরোপুরি উদ্ভাসিত হয় আত্মীয়-স¦জন, পাড়া-প্রতিবেশী তথা সকলের সাথে পবিত্র ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে।
আল্লাহর হুকুমে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মাসব্যাপী রোযা রাখার পর ঈদের নামায আদায় করার উদ্দেশ্যে ঈদগাহে গেলে একে অপরের হাতে হাত, বুকে বুক রাখলে মুসলমান ভুলে যায় সারা মাসের উপবাসের কষ্ট। ঈদের নামায হলো সামাজিক নামায। বছরান্তে দু’দিন সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা ঈদের জামা’আতে সানন্দে উপস্থিত হয়। একে অন্যের সাথে সাক্ষাত ও কুশল বিনিময়ের একটা অপূর্ব সুযোগ আসে এ দিনে। তখন ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, আমীর-ফকীর, শিক্ষিত-অশিক্ষিতের কোন ভেদাভেদ থাকে না। মহান আল্লাহর কাছে আত্মনিবেদনের পর একে অন্যের সাথে বুক মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে অনন্য সুযোগ লাভ করা যায়, তার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ঈদের নামায। ঈদুল ফিতরের সময় সমাজের গরীব-দুঃখীকে সাদ্কা-ফিতর প্রদান এবং একে অপরের সাথে সাক্ষাতে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয় তা-ই দুনিয়াকে বেহেশ্তের বাগানে পরিণত করে।
ঈদের দিন ও ঈদের রাতের ফযিলত অসীম। হযরত নবী করীম (সা.) যে পাঁচটি রাতের দু’আ কবুল হওয়ার কথা বলেছেন তার মধ্যে ঈদুল ফিতরের রাতটি অন্যতম। নবী করীম (সা.) আরো বলেন, প্রত্যেক জাতিরই খুশীর দিন থাকে, আর আমাদের খুশীর দিন হচ্ছে- ঈদুল ফিতরের দিন (বুখারী ও মুসলিম)।
ঈদ উৎসবের সন্ধিক্ষণে কে কতো দামী এবং সুন্দর পোশাক পরলো বা কে কতো উন্নতমানের, সুস্বাদু পানাহার করলো সেটা কখনো বিচার্য নয়, বরং বিচার্য বিষয় হচ্ছে পার্থিব জগতের সর্ব প্রকার লোভ-লালসা বিসর্জন দিয়ে নিজ আত্মাকে কে কতটুকু নিষ্পাপ রাখতে পেরেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ত্যাগ স্বীকার করে তার নৈকট্য লাভে সফলকাম হয়ে কে কতটা ধন্য হয়েছে।
অপর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন উপস্থিত হলে আল্লাহ তায়ালা রোযাদার বান্দাদের বিষয়ে ফেরেশ্তাদের নিকট গৌরব করে থাকেন। তিনি ফেরেশ্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,- হে ফেরেশ্তা সকল! কারো উপর কোন কাজের দায়িত্ব অর্পিত হলে সে যদি পুরোপুরিভাবে তা পালন করে, তবে তাকে কিরূপ প্রতিদান দেয়া উচিত? ফেরেশ্তারা উত্তরে বলেন, তাকে তার পরোপুরি পারিশ্রমিক দেয়া উচিত। তখন আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, আমি আমার বান্দাদের উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলাম তারা তা যথাযথভাবে পালন করেছে। অতঃপর মু’মিন বান্দাগণ যখন দলে দলে দু’আ পাঠ করতে করতে ঈদগাহের দিকে রওয়ানা হয়, তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,- আমার ইজ্জত-প্রভাব-প্রতিপত্তির কসম! আমি অবশ্যই তাদের দু’আ কবুল করবো। তারপর তিনি বান্দাদের উদ্দেশ্যে ডেকে ডেকে বলেন,- হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি, তোমাদের পাপকার্য সমূহকে পূণ্যে পরিণত করে দিয়েছি; এবার তোমরা নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। তখন তারা নিষ্পাপ অবস্থায় এবং প্রভূত পূণ্যের অধিকারী হয়ে স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করে।’
ঈদুল ফিতরের দিন কতিপয় কাজ করা সুন্নত। আর তা হলো: (১). যতদূর সম্ভব অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করা। (২). মিস্ওয়াক করা এবং সকাল সকাল গোসল করা। (৩). নিজের সাধ্যানুযায়ী উৎকৃষ্ট তথা পবিত্র, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিধান করা। (৪). সুগন্ধিদ্রব্য ও চোখে সুরমা ব্যবহার করা। (৫). যথাশীঘ্র প্রত্যুষে ঈদগাহে গমনে অযথা বিলম্ব না করা। (৬). সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম খাবারের বন্দোবস্ত করা এবং প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ইয়াতীম, ফকীর-মিসকীন, গরীব-দুঃখীকে পানাহার করানো। (৭). ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টিমুখ করা, আর ঈদুল আযহার নামাযের পূর্বে কোন প্রকার আহার গ্রহণ না করে নামাযের পর যথাশীঘ্র সম্ভব পশু কুরবানী করে সেই গোশ্ত দ্বারা আহার করা। (৮). ঈদগাহে গমনের পূর্বেই সাদ্কায়ে ফিতর আদায় করা। (৯). ঈদগাহে এক পথে যাওয়া আর ফেরার সময় অন্য পথে আসা এবং যথাসম্ভব পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। (১০). ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পথে চুপে চুপে তাক্বীর (আল্লাহু আক্বার আল্লাহু আক্বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আক্বার ওয়াল্লাহু আক্বার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ) পাঠ করা আর ঈদুল আয্হা তথা কুরবানীর ঈদের দিন উচ্চস্বরে ওই তাক্বীর পাঠ করা।
ঈদের দিন এবং রাতের মতো ঈদের নামাযের গুরুত্বও অপরিসীম। ঈদ আসে বিশ^-মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে বাৎসরিক আনন্দের বার্তা নিয়ে, আসে সীমাহীন প্রেম-প্রীতি, সৌহার্দ-ভালোবাসা ও কল্যাণের সওগাত নিয়ে, সেই ঈদকে যথার্থ মর্যাদায় উদ্যাপন করা এবং ঈদের নামায যথাযথভাবে আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। বছরে দু’দিন বিশ^ মুসলিমের জন্য যে মহাসম্মিলনের ব্যবস্থা মহান আল্লাহ তায়ালা করে দিয়েছেন, যার অনুপ্রেরণায় সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ পারে কুরআন নির্দেশিত সমাজ নির্মাণ করতে, পারে ন্যায়-নীতি ও ইন্সাফ ভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিতে, সমাজের কলুষতা বিদূরিত করতে, পারে দল-মত নির্বিশেষে হিংসা-বিদ্বেষ-কলহ ভুলে পরস্পর প্রেম-প্রীতির ডোরে আবদ্ধ হয়ে ঈদের আনন্দের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করতে যার মাধ্যমে এ নিখিল ধরায় স্বর্গের আবহ সৃষ্টি হতে পারে।

Shamol Bangla Ads

লেখক : কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও বিসিএস (সা.শি) ক্যাডার কর্মকর্তা।

Need Ads