নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি: শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেষা বারমারী সাধু লিওর খ্রীষ্টান ধর্মপল্লীতে ‘শান্তি, মিলন ও ভালবাসার উৎস ফাতেমা রাণী মা-মারীয়া’ এই মুল সুরের উপর ভিত্তি করে দু’দিনব্যাপি ১৮তম তীর্থ উৎসব কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শান্তিপুর্ণভাবে পালিত হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার দেশি-বিদেশি রোমান ক্যাথলিক খ্রীষ্টভক্ত এতে অংশ গ্রহন করেন। দিনাজপুর ক্যাথলিক খ্রীষ্ট ধর্মপ্রদেশের বিশপ সেবাষ্টিয়ান টুডু এ তীর্থ উৎসবের উদ্বোধনী ও সমাপনী খ্রীষ্টযাগ উৎসর্গ করেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৩.০০ টায় পাপ স্বীকার/পুর্নমিলনী, ৪.০০ টায় পবিত্র খ্রীষ্টযাগ, রাত ৮টায় আলোক শোভাযাত্রা, ১১.০০টায় আরাধ্য সাক্রান্তের আরাধনা, নিরাময় অনুষ্ঠান ও রাত ১২ টায় নিশি জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৮ টায় জীবন্ত ক্রুশের পথ ও সকাল ১০টায় মহা খ্রষ্টযাগের মাধ্যমে তীর্থ উৎসবের সমাপ্তী হয়। শেষ দিন শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন তীর্থ উৎসবে অংশ গ্রহন করেন।
এ তীর্থযাত্রায় খ্রীষ্টভক্তরা নিজেদের পাপ মোচনে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোর মিছিলে অংশ গ্রহন করে প্রায় ২ কিলোমিটার পাহাড়ী ক্রুশের পথ অতিক্রম শেষে দেশের সর্ববৃহৎ ৪৭ ফুট উচু মা-মারিয়ার মুর্তির সামনের বিশাল প্যান্ডেলে সমবেত হয়ে স্নেহময়ী মাতা ফাতেমা রাণীকে ভক্তি শ্রদ্ধা জানায় ও তার অকৃপন সাহায্য প্রার্থনা করেন। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা আর উঁচু-নিচু রাস্তা বেয়ে নান্দনিক আলোর মিছিল দেখতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর হাজার হাজার মানুষ উৎসব দেখতে সমবেত হয়। এদিকে তীর্থো উৎসব উপলে পাশের স্কুল মাঠে ও রাস্তারপাশে আনন্দঘন পরিবেশে বসে মেলা তথা বাহারি জিনিস পত্রের দোকান। এছাড়াও রকমারী খাবারের অস্থায়ী হোটেল স্থাপন করা হয়।
বারমারী সাধু লিওর ধর্মপলল্লীর সহ-সভাপতি মি. লুইস নেংমিনজা ও সাধারন সম্পাদক মি. প্রদীপ জেংচাম বলেন, এবারের তীর্থযাত্রায় আমেরিকা, ইটালি, স্পেন, ফিলিপাইন ও ভারতের পুরোহিতরা অংশ গ্রহন করেন। হাজার হাজার খ্রিষ্টভক্ত ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ধর্মপলীর পালপুরোহিত, ব্রাদার ও সিস্টারগন অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকার মিরপুরের তীর্থযাত্রী রেজিনা নকরেক জানান, তিনি মা-মারিয়ার কৃপা লাভের আশায় এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, তার অসুস্থ্য স্বামী ও জেএসসি পরীার্থী ছেলের জন্য প্রার্থনা করেন।
খুলনা খালিশপুরের বৈকালী এলাকার অপর তীর্থযাত্রী বলেন, নিজের মনোবাসনা পুরন ও ইশ্বরের সান্নিধ্য লাভের আশায় তিনি সুদুর খুলনা থেকে এবারের তীর্থ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে তীর্থযাত্রা সম্পন্ন করতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মানত পুরন হলে আগামীতে আবারও আসবেন বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
এবারের তীর্থ উৎসবে সরকারের সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন, শেরপুরের জেলা প্রশাসক ডাঃ এএম পারভেজ রহিম, শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল ওয়ারীশ, নালিতাবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম মুখলেছুর রহমান রিপন, নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোলা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক, ভাইস চেয়াম্যান আছমত আরা আছমা, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র সরকার, নালিতাবাড়ী উপজেলা সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান মো: আজাদ মিয়াসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দরা তীর্থ অনুষ্ঠানে যোগদান করে খ্রীষ্টভক্তদের খোঁজ খবর নেন ও তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
তীর্থ উৎসবের কো-অর্ডিনেটর রেভারেন্ট ফাদার মনিন্দ্র এম. চিরান বলেন, পর্তুগালের ফাতেমা নগরের আদলে ও অনুকরনে বাংলাদেশের শেরপুরের নালিতাবাড়ীর বারমারী খ্রীষ্টধর্ম পলীতে ফাতেমা রাণীর তীর্থস্থান স্থাপন করা হয়েছে। এ তীর্থস্থানে তীর্থযাত্রীরা তাদের ধর্মীয় অনুভুতিতে মনের পরিবর্তন, মানসিক প্রশান্তি ও আধ্মাতিক ুধা নিবারনের আশায় অংশ গ্রহন করে থাকেন। ১৯৯৮ সাল থেকেই এখানে তীর্থ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। তাই প্রতি বছর এ তীর্থ স্থানে দেশি-বিদেশি তীর্থযাত্রীর সংখ্যাও বেড়েই চলছে।
তীর্থ উৎসবের প্রধান আলোচক দিনাজপুর খ্রিষ্টধর্ম প্রদেশের বিশব সেবাষ্টিয়ান টুডু বলেন, এই পুণ্যযাত্রায় সারা দেশ থেকে ২৫-৩০ হাজার খ্রিষ্টভক্তরা মা-মারিয়াকে ভক্তি, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সমবেত হয়েছেন। তারা আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন। এবারের ১৮তম তীর্থ উৎসব শান্তিপুর্নভাবে পালিত হওয়ায় এটি সার্বজনীন উৎসবে পরিনত হয়েছে। আস্তে আস্তে এই বারমারী ফাতেমা রানীর তীর্থ স্থানটি আন্তর্জাতিক তীর্থস্থানে পরিনত হবে। এখানে সকল ধর্মের লোকজন মানত করে ফল লাভ করছেন।




