মজনু, রূপগঞ্জ : হাত দেখে বলে দেন বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা। রাস্তার পাশে বসেই সাধারণ জনগণকে বলছেন ভবিষ্যৎ সুখ-দুঃখের, আপদ ও বিপদের ভবিষ্যদ্বাণী। হাতের মাঝেই নাকি প্রতিটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। আর হাত দেখেই এসব বলছেন জ্যোতিষিরা। জনগণকে বোকা বানিয়ে ঝার-ফোক, তাবিজ-কবজ আর পাথর বেচে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। হস্তরেখায় বিশ্বাসী এসব জনগণ প্রায় প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে ও বিভিন্ন অফিসে হস্তবিদদের কাছে প্রতারিত হচ্ছেন। অনেক তরুণ তরুণী প্রেমবিরহ, মনের মতো সঙ্গী খোঁজার জন্য সরণাপন্ন হচ্ছেন ধান্নবাজ হস্তবিশারদ জ্যোতিষিদের কাছে। মনের মানুষ খোঁজা ও পছন্দের মানুষকে বশ করার জন্য হাতের রেখা মিলিয়ে দেয়ার আশ্বাসে ছুটছেন জ্যোতিষিদের কাছে। এমন এক জ্যোতিষি আব্দুর রশিদ। বয়স পঞ্চাশের কোটায়।

জ্যোতিষ শাস্ত্রের অভিজ্ঞ পরিচয় দিয়ে রূপগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন হাট-বাজার ও অলিতেগলিতে হাতের ব্যবসা করছেন। গাইবান্দা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ধাপের হাট গ্রামের সুরুজ মণ্ডলের ছেলে আব্দুর রশিদ ১৫ বছর আগে সংসারের অভাব গোছানোর তাগিদে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। দিনমজুরের কাজ করার একপর্যায়ে কাজ নেন মগবাজারের এক হস্তবিদ জ্যোতিষির পিয়ন হিসেবে। অক্ষর জ্ঞানহীন আব্দুর রশিদ ওই জ্যোতিষির কাছ থেকেই দীক্ষা নেন হস্তবিদ্যার ওপর। একটানা ৩ বছর তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এক সময় চাকরি ছেড়ে নিজেই এ ব্যবসা শুরু করেন। নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে না পারলেও অন্যের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়ার ক্ষমতা নাকি তার আছে। হস্তরেখায় বিশ্বাসী মানুষের ধ্যান ধারণার সুযোগে শুরু করেন প্রতারণা। আয় রোজগারও ভালো। ৩ মেয়ে ২ ছেলের পিতা আব্দুর রশিদ বিয়ে করেছেন ৩টি। অভাবের তাড়নায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী তার সংসার ছেড়ে চলে গেলেও হস্তবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার পর আবারো বিয়ে করেন চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের গার্মেন্টকর্মী রেহেনা আক্তারকে। একসময় ঢাকার বস্তিতে বসবাস করলেও আয় রোজগার ভালো হওয়ায় চলে আসেন চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে। কিছুদিন চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে থেকে হাত দেখে লোকজনের রোষানলে পড়েন। ধরা পড়ে তার প্রতারণা ব্যবসা।
অবশেষে স্থানীয়দের ধাওয়া খেয়ে ছাড়েন চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র। চলে যান মাতুয়াইলের কোনাপাড়া এলাকায়। সেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল থেকেই রূপগঞ্জের গাউছিয়া, তারাব বিশ্বরোড, কাঁচপুর, চিটাগাংরোডসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার মোড়ে জনবহুল এলাকায় ফুটপাতের ওপর বসে হাত দেখার ব্যবসা করে যাচ্ছেন।

সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে বিভিন্ন তাবিজ-কবজ ও পাথর বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন অর্থ। প্রতারণা করতে গিয়ে জেল খেটেছেন দু’বার। প্রতারিত জনগণের হাতে অসংখ্যবার লাঞ্ছিতও হয়েছেন। লাঞ্ছনা আর পুলিশের চোখ এড়িয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায় ফিরে যান তিনি। বিভিন্ন লোকজনের সাথে প্রতারণা করে হাতের রেখা দেখেই বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে দেন। এ প্রতারণা ব্যবসার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, কাজটা সম্পূর্ণ অনুমান নির্ভর। বাস্তবতার সাথে এর মিল নেই ততটা। সৃষ্টিকর্তাই যার যার ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। হাত বা অন্য কোন অঙ্গ-প্রতঙ্গে এর কোন প্রতিফলন হয় না। তারপরও আদিকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন হস্তবিদ, জ্যোতিষি ও ঝার-ফোকের কবিরাজের কাছে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ধরনা দেন। সেই সুযোগ নিয়েই চলে ব্যবসা।
তিনি বলেন, প্রাচীনকালের রাজা-বাদশারা মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে নিজেদের ভাগ্য রেখা ও হস্তরেখা দেখে যুদ্ধের জয় পরাজয়সহ বিভিন্ন কিছু জানার চেষ্টা করতেন। কাল্পনিক কাহিনী ও সিনেমাগুলোতে এসব ঘটনা সুন্দরভাবে ফুটে ওঠায় হতাশাভোগী মানুষরা চলে আসেন আমাদের মতো হস্তরেখাবিদ ও কবিরাজের কাছে। হতাশার সুযোগ নিয়েই বিভিন্ন রকমের পাথর, তাবিজ-কবজ ও ঝাড় ফোঁক দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেয়া হয়। এদিকে এসব প্রতারক জ্যোতিষিদের খপ্পরে পড়ে কাড়ি কাড়ি টাকা খোয়াচ্ছেন ভুক্তবোগীরা। টাকা খরচ করে কোন ফল না পেয়ে ভুক্তভোগীরা প্রতারকদের আটক করে গণপিটুনী দেয়ার ঘটনাও ঘটাচ্ছেন। এমন একাধিক ঘটনার শিকার হয়েছেন আব্দুর রশিদ।
গত ৩ বছর আগে ডেমরা এলাকার এক ছাত্রলীগ নেতা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকার মন পাওয়ার জন্য ছুটে আসেন তার কাছে। হাত দেখে তার প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় ওই ছাত্রলীগ নেতাকে একাধিক পাথর দিয়ে প্রেমিকার সাথে দেখা করতে বলেন। এতেও কাজ না হওয়ায় আবার একটি তাবিজ গলায় পরে পছন্দের মেয়েটির সাথে দেখা করতে বলে দেন জ্যোতিষি। এতেও ফল না হওয়ায় ওই ছাত্রলীগ নেতা তাকে ডেমরা স্টাফকোয়ার্টার এলাকা থেকে তুলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে বেধম প্রহার করেন। পরে ছাত্রলীগ নেতার টাকা পয়সাসহ অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান তিনি।
এর কয়েক মাস পরই এক শিল্পপতির স্ত্রীর কাছ থেকে হাত দেখে সংসারে শান্তি আনার প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নেন কয়েক লাখ টাকা। একসময় সংসারে শান্তি ফিরে না আসায় শিল্পপতির স্ত্রী থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে প্রতারণার দায়ে জেল খাটেন প্রায় দুই মাস। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো জড়িয়ে পড়েন আগের ব্যবসায়। কিন্তু এখন আর প্রতারণা করেন না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে সাধারণ জনগণের হাত দেখে ১০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ভিজিট নেন। এ দিয়েই চলছে তার সংসার। তবে আগের মতো সচ্ছল নন তিনি। অভাবের তাড়নায় বড়মেয়ে ও স্ত্রীকে সিনহা গার্মেন্টে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।




