ইমরান হোসাইন, তানোর : ওরা চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত । দারিদ্র ওদের নিত্য সঙ্গী । পেটে ভাত জোটে না, পরনের ন্যূনতম চাহিদা মত কাপড় থাকে না। এরপরও লেখা পড়ার করার ইচ্ছা প্রকাশটাই বুঝি অযৌক্তিক আবদার ওদের। তবুও তারা দমেনী। হার মানেনি দারিদ্র্যের কাছে। নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই ওরা ভবিষ্যৎ গড়ার পথে হাটছে। মূল লক্ষ্য সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দারিদ্র্র্য দূর করে পরিবারের স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানো। এজন্য জীবনযুদ্ধে নেমে শত বাধা পেরিয়ে ওরা দেখিয়েছেন বিশেষ কৃতিত্ব। রাজশাহীর তানোর পৌরসভার আকচা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় প্রকাশিত ফলাফলে ওরা তিনজন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
সন্তানের এমন সাফল্যে বেজায় খুশি তাদের হতদারিদ্র্য পিতা-মাতা। মেধাবী হওয়ায পড়ালেখায় সব সময় অনুপ্রেরনা যোগাতেন তাদের পিতা-মাতাসহ স্কুলের শিক্ষকরা। এজন্য শত প্রতিকুলতা সত্তে¡ও তাদের পড়ালেখায় ছেদ পড়েনি। ক্লাসে ভালো হওয়ায় স্কুল শিক্ষকরা তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের স্বপ্ন তারা বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্য তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বিশাল বাধা। এই বাধা ডিঙিয়ে সেই স্বপ্ন পূরন হবে কিনা সেই চিন্তায় এখন তাদেরকে চেপে বসেছে।
এরা হলেন তানোর পৌরসভার বুরুজ গ্রামের আতাউরের ছেলে আবদুর রাহিম, আকচা গ্রামের সজীব ও সরণজাই ইউনিয়নের সিধাঁইড় গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে মৌসুমী ও এবার জেএসসি পরীক্ষায় আকচা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছেন।
এনিয়ে, রাহিমের মাতা সুকমন বেওয়া এই প্রতিবেদকে জানান, মাটির বাড়িতে একটি মাত্র কুড়ে ঘর। পরিবারের সকলে এক সঙ্গে ঘুমায়। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। হারিকেনের আলোতে রাহিম রাত জেগে পড়া-লেখা করতো। প্রাইভেট পড়ানোর মত তার সমর্থ ছিলো না। কারণ রাহিমের পিতা ছোট থাকা অবস্থায় মারা গেছে। তিনি হাঁসমুরগী পালন করে ও মানুষের বাড়িতে কাজ করে ছেলের পড়ালেখার খরচ যোগান। ছেলের পড়া-লেখার আগ্রহ দেখে তিনি এত কষ্ট করে পড়া-লেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। সংসার চলে না তার, তাঁর উপর পড়া লেখার বাড়তি খরচ। তার এক কাঠাও জমি নেই। হাতে কাজ করে পেটে খাই। তিনি চান তার ছেলে শহরের ভাল কলেজে পড়াশুনা করুক। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সামর্থ্য নেই। তার ইচ্ছে তার ছেলে শহরের ভাল কলেজ থেকে পাস করে ইঞ্জিনিয়ার হোক। তার ইচ্ছা পূরণ করতে সমাজের কোন বিত্তবান মানুষদের সাহার্র্য্যরে হাত বাড়িয়ে সহযোগীতা করার অনুরোধ জানান। তার ছেলের লেখাপড়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসলে তিনি চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন।
অপরদিকে, মৌসুমীর পিতা বলেন, তার কোন দিন ঘরে খাবার থাকে না। প্রায় দিন তার মেয়ে খেয়ে না খেয়ে স্কুলে গেছে। তার স্বপ্ন মেয়েকে শহরের ভাল কলেজে পড়ানো। কিন্তু তার ইচ্ছে পূরণ হবে কি না তিনি জানেন না। অর্থের অভাবে স্বপ্ন তার স্বপ্ন রয়ে যাবে। অনেকে এসেছিল মৌসুমীকে শুভেচ্ছা জানাতে। সমাজের ধনী ব্যক্তিরা এখনো পর্যন্ত কেউ সাহায্যর হাত বাড়ায়নি।
অন্যদিকে, সজীবের পিতা ভ্যান চালক বলেন, তিনি সারাদিন রাস্তায় ভ্যান চালিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় করেন। ভ্যান চালানো টাকা দিয়ে তার সসার চলে না। এরপর ছেলের লেখাপড়ার আগ্রহ দেখে ছেলেকে লেখাপড়া ছেড়ে রাস্তায় ভ্যান চালাতে ইচ্ছে হয় না। তিনি শত কষ্টে এখন পর্যন্ত ছেলের কোনমতে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাবি সমাজের ধনী মানুষেরা তার ছেলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
এবিষয়ে আকচা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসলাম উদ্দিন বলেন, ওরা গরীবের ঘরে জন্ম নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করে লেখা-পড়া করে তারা আজ সার্থক হয়েছে। তিনি দোয়া করেন তারা বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হয়ে সমাজের সেবা করবে। তাঁদের ভবিষ্যত জীবনের সাফল্য কামরা করেন।




