স্টাফ রিপোর্টার : এবার শেরপুরে সুপারী চুরির অজুহাতে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নুরে আলম (১২) কে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে শেরপুর সদর আমলী আদালতে ওই মামলাটি দায়ের হলে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুর রহমান তা গ্রহণ করে সরাসরি নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। স্কুলছাত্র নুরে আলম সদর উপজেলার মুন্সীরচর পূর্বপাড়া এলাকার দরিদ্র কৃষক গোপন মিয়ার ছেলে ও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ওই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
জানা যায়, স্কুলছাত্র নুরে আলমের বাবা গোপন মিয়ার সাথে প্রতিবেশি উমেদ আলী গংদের পূর্ব শত্রুতা চলে আসছিল। ওই শত্রুতার জের ধরে ৩১ জানুয়ারি রবিবার সন্ধ্যার পর নিজেদের বাগানের গাছ থেকে সুপারী চুরির অজুহাতে নুরে আলমকে উমেদ আলীর ছেলে মতি মিয়া ও তার বাড়ির লোকজন আটক করে শারীরিক নির্যাতন চালায়। ওই অবস্থায় নুরে আলম নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে মতি মিয়ার ঘরে আটক রাখে তারা। অন্যদিকে নুরে আলমকে সুপারী চুরির অজুহাতে আটকে নির্যাতনের সংবাদ পেয়ে বাবা গোপন মিয়া ও মা নুরুন্নাহার বেগম মতি মিয়াদের সুপারী বাগানে ছুটে গেলেও তারা জানায়, চড়-থাপ্পড় দেওয়ার পর নুরে আলম চলে গেছে। কিন্তু পরদিন সোমবার সকালে পার্শ্ববর্তী একটি কাঠাল গাছের ডালে নিজের গায়ের জ্যাকেট মোড়ানো অবস্থায় নুরে আলমের লাশ দেখা যায়। খবর পেয়ে থানা পুলিশ নুরে আলমের লাশটি উদ্ধার করলে তৎক্ষণাৎ তার ঘাড় মটকানো ও মুখে, গলায়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হলে পারিবারিকভাবে দাফন করা হয়। কিন্তু থানা পুলিশ ওই ঘটনায় হত্যা মামলা না নিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করে। ফলে নুরে আলমের বাবা বাদী হয়ে মতি মিয়া (৪৫) সহ ৭ জনকে আসামী করে বৃহস্পতিবার আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অন্যান্য আসামীরা হলেন, মতি মিয়ার বাবা উমেদ আলী (৬৫), ভাই শেখ মিয়া (৩৭), ভাইবউ নাসরিন বেগম (২৮), স্ত্রী মোর্শেদা বেগম (৪০), পুত্র মামুন মিয়া (২৬) ও মেয়ে মালেকা খাতুন (২০)।
নুরে আলমের বাবা গোপন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, সুপারী চুরির অভিযোগটি ছিল সাজানো। মূলতঃ পূর্ব শত্রুতার কারণে ছেলে নুরে আলমকে স্থানীয় প্রভাবশালী মতি মিয়া ও তার বাড়ির লোকজন সুপারী চুরির অজুহাতে আটক করে অমানসিক শারীরিক নির্যাতনের কারণেই সে প্রাণ হারিয়েছে। আর ওই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর জন্য নুরে আলমের লাশ কাঠাল গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখেছে। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, আমি আমার ছেলের হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই। অভিযোগ সমর্থন করে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ও সাবেক ইউপি সদস্য জবির উদ্দিন বলেন, ১১ বছরের একটি ছেলের আত্মহত্যা করার মতো কোন কারণ থাকতে পারে না। একটি প্রভাবশালী মহলের তদবিরের কারণেই ওই ঘটনায় থানা পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা নিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি এডভোকেট প্রদীপ দে কৃষ্ণ বলেন, সরকার দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করার পরও নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা কমছে না। এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ গণআন্দোলন গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করে সুপারী চুরির ঘটনায় স্কুলছাত্র নুরে আলমকে পিটিয়ে হত্যার বিষয়ে বলেন, পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী অপরাধবোধ ও আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টির কোন কারণ দেখি না। একই কথা জানিয়ে নারী শিশুর প্রতি সহিংসতা রুখে দাড়ানোর আহবান জানান জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি জয়শ্রীনাগ লক্ষ্মী।

এদিকে স্কুলছাত্র নুরে আলমের ঘটনায় আদালতে হত্যা মামলা দায়ের প্রসঙ্গে শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল করিম বলেন, বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনও আদালতের কোন আদেশ পাইনি। আদেশ পেলে ব্যবস্থা নেব। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হওয়ায় ইউডি মামলা নেওয়া হয়েছে। ময়না তদন্ত রিপোর্টে হত্যার আলামত পেলে পরবর্তীতে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




