এম লুত্ফর রহমান, নরসিংদী : নরসিংদীর রায়পুরার নিলক্ষার চরের লাঠিয়াল বাহিনীর টেটা যুদ্ধ দিন দিন গ্রাম্য দাঙ্গার দিকে ধাবিত হচ্ছে। একের পর এক টেটা যুদ্ধে গ্রামগুলো লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। মানুষ জান ও মালের নিরাপত্তা হারিয়ে সার্বক্ষণিক উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। পুলিশ দাঙ্গা দমনে কোনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। অব্যাহত টেটা যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার আবারো বিবদমান দুই লাঠিয়াল বাহিনীর মধ্যে টেটা যুদ্ধ সংগটিত হয়েছে। নিলক্ষার চরের দড়িগাও গ্রামের শহীদ মেম্বার ও হরিপুর গ্রামের সুমেদ আলী বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত এ টেটা যুদ্ধে উভয় পক্ষের কমবেশী ৩০ ব্যক্তি আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে মিষ্টার মিয়া (২৪), আবু ছিদ্দিক (২২),শাহীন মিয়া (১৮), হানিফা (২৪), তাহার মিয়া (৩০), মনির হোসেন (২৫), রিপন মিয়া (২৪), বাবুল (২৬), জামাল (৩০) ও খোকা মিয়া (২৮) নামে ১১ জনের নাম পাওয়া গেছে। অন্যান্য আহতরা নরসিংদী ও পাশ্ববর্তী নবীনগর উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে। গত ৫ এপ্রিল দুই লাঠিয়াল বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত দীর্ঘ ৯ ঘন্টা ব্যাপী টেটা যুদ্ধে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার ঘটনার ১১ দিনের মাথায় এটি দ্বিতীয় ভয়াবহ টেটা যুদ্ধ। সেদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশকে প্রায় দেড়শত রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। বর্ষণ করতে হয়েছে ফাঁকা গুলি।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানিয়েছে, ২০১২ সালে ২১ অক্টোবর একই চরের গোপীনাথপুর গ্রামের জজ মিয়া ও রহিম গ্রæপের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে গ্রামে এক শালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রকাশ্য দরবারে হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় টেটা যুদ্ধ। এই টেটা যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে গ্রাম্য দাঙ্গার রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পার্শবর্তী হরিপুর, দড়িগাঁও, বীরগাঁও ও আমিরাবাদ গ্রামে। এক পর্যায়ে রহিমের পক্ষে যোগ দেয় হরিপুর গ্রামের সুমেদ আলী ও জজ মিয়ার পক্ষে দড়িগঁাঁও গ্রামের সহিদ মেম্বার। এতে করে গত দুই বছরে বিক্ষিপ্ত কয়েক দফা সংঘর্ষে দুই পক্ষের টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ৪ ব্যক্তি নিহত হয়। এ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ হয়েছে প্রায় ২৫টি বসত ঘরে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকারও উপরে সম্পদ। খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে অনেক পরিবার।
বিরোধ মিমাংসার জন্য ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী রাজি উদ্দিনের নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসন দুই পক্ষের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করে দেয়। দীর্ঘ চার মাস বিরতির পর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্লেখিত গ্রæপের মাঝে পুনরায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। চলতি বছর গত ৩০ মার্চ সহিদ মিয়ার সমর্থক দড়িগাঁও পূর্বপাড়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে জুসেদ মিয়া মাঠে কাজ করতে গেলে সুমেদ আলীর সমর্থক জাকির হোসেন তাঁর দলবল নিয়ে হামলা চালায়। এ ঘটনার জের ধরে গত ৪ ও ৫ এপ্রিল বেলা এগারটার দিকে দড়িগাও ও হরিপুর গ্রামের সীমানা এলাকায় দুই পক্ষের সমর্থকরা টেঁটাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি টেঁটাবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৭ এপ্রিল সুমেদ আলীর লোকজন সহিদ মিয়ার এক সমর্থকের একটি গরু এবং ফসলী জমি থেকে মরিচ লুটপাট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনা কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মাঝে আবার সংঘর্ষের সূচনা হয়। বুধবার সকাল থেকেই দুই পক্ষের লোকজন টেঁটা, বল্লাম, দা, ককলেটসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেলা ১২টার দিকে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় টেঁটা ও ককটেল বিস্ফোরণে উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ ব্যক্তি আহত হয়।
খবর পেয়ে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল মতিন ও সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) একে এম জহিরুল ইসলাম এবং নরসিংদী ও রায়পুরা থানা পুলিশ দীর্ঘ তিন ঘন্টাব্যাপী চেষ্টা চালিয়ে বিকালে ৪টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন আনতে সক্ষম হয়।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করা হয়েছিল। কিন্তু তা কোন কাজে আসেনি। ইতঃপূর্বে দুই দফা সংর্ঘষের পর আজও তাঁরা আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।




