।। তালাত মাহমুদ ।।

সেই রাতে নূহাশ পল্লীতে (উপন্যাস) রচনা-খ.ম.রোকন-উদ-দ্দৌলাহ, ইতি প্রকাশন-এর পক্ষে মো: জহির দিপ্তী কর্তৃক বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত, প্রচ্ছদ একেঁছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি, প্রকাশকাল, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬১, মূল্য- ৮০ টাকা।
কোটি পাঠকের প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে কৌতহলের শেষ নেই। এই জনপ্রিয় কথা শিল্পীর ভক্ত, অনুরক্ত ও শিক্ষার্থীদের মাঝে হুমায়ুন প্রীতি আজও তাপিয়ে বেড়ায়। যার নিদর্শন হিসেবে আমরা উলেখ করতে পারি ‘সেই রাতে নূহাশ পল্লীতে’ এই উপন্যাসের কথা। উপন্যাসটির লেখক খ.ম.রোকন-উদ-দ্দৌলাহ। পেশায় একজন প্রকৌশলী। কর্মজীবনে ভীষণ ব্যস্ত থাকার পরও তিনি রচনা করেছেন ‘সেই রাতে নূহাশ পল্লীতে’।

এই উপন্যাসটি অমর কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমদকে নিয়ে লেখা। উপন্যাসে হুমায়ুন আহমেদের অদ্ভুত চিন্তা, চেতনা, স্বপ্ন ও ইচ্ছা এবং আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছে। গ্রন্থে নাদের আলী লোকটি কে? হুমায়ুন আহমেদ তাকে কিভাবে পেয়েছিলেন? জ্যোতিষী আলী হোসেন হুমায়ুন আহমেদের হাত দেখে কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন? তার কতটুকু বাস্তবে রূপ প্ররিগ্রহ করেছে? নাদের আলী নূহাশ পল্লীতে কেন গিয়েছিল? ঐ সময় নূহাশ পল্লীতে কি ঘটেছিল? নাদের আলী কেন প্ল্যানচেট করেছিল? হুমায়ুন আহমেদ এখন উর্ধ্বজগতে কি করছেন? এই উপন্যাসের নন্দিতা নামের নারীটি কে? নন্দিতার গর্ভে কে আসতে রাজী হয়েছে? তার কাছে হুমায়ুন আহমেদ কি পাঠিয়ে দিবেন? প্ল্যানচেটের মাধ্যমে মর্তলোকে ফিরে আসার পর হুমায়ুন আহমেদ নাদের আলীর সাথে কী কথোপকথন করেছেন এবং উর্ধ্বজগতে চলে যাওয়ার সময় নাদের আলীকে কী বলে গেছেন? এরকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রোকন-উদ-দ্দৌলাহ রচনা করেছেন এই উপন্যাসটি।
লেখক তার উপন্যাসে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধ ও তখনকার একটি পরিবারের করুণ পরিণতি এবং বাচ্চু নামের একজন কুখ্যাত রাজাকারের পাষন্ডতার কথা ও হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুর অত্যাচারের খন্ডচিত্র বিবৃত করেছেন। খ.ম.রোকন-উদ-দ্দৌলাহ তার গন্থে স্বল্প পরিসরে নানা খন্ডচিত্র তুলে ধরেছেন যা সচেতন পাঠক মহলকে ভাবিয়ে তুলবে। হুমায়ুন আহমদের সংগ্রহে থাকা আমেরিকার প্রখ্যাত লেখক হেনরি মিলারের উপন্যাস ‘টপিক অব ক্যান্সার’ উপন্যাসটির কিছু অংশ পড়ে শোনান । এখানে পাঠকদের কাছে হুমায়ুন ভক্ত লেখক রোকন-উদ-দ্দৌলাহ হুমায়ন আহমেদের ক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি সরাসরি উলেখ করতে পারেননি। তাই তিনি ইংরেজী সাহিত্যের এই উপন্যাসটি উপস্থাপন করেছেন। এরপর হুমায়ুন আহমেদ সাইন্স ফিকশনের একটি বই এর প্রথম অধ্যায়ের শেষ অংশ এবং চতুর্থ অধ্যায়ের কিছু অংশ পড়ে শোনালেন। পড়া শেষ করে বললেন –নাদের আলী কেমন লাগল? নাদের জবাবে বলে, খুব ভাল স্যার। বেশ মূল্যবান বই। এখান থেকে অনেক কিছু শিখার আছে। সাইন্স ফিকশন পাশ্চাত্য সাহিত্যের নতুন মাত্রা। নাদের আলী বলে, রাধা-কৃষ্ণ আর শিরি-ফরহাদের প্রেমের দিন ফুরিয়ে গেছে। এখন আধুনিক বিজ্ঞানের যুগ। লেখালেখি করতে হলে সাইন্স ফিকশন নিয়ে ভাবতে হবে, নতুবা পাঠক খাবে না।……..এক্সিলেন্ট নাদের আলী, আমি যা ভেবেছি তুমি তাই বলেছো। আমিও তোমার সাথে একমত। হুমায়ুন আহমেদ আরও বলেন, আধুনিক সাহিত্যের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সাইন্স ফিকশনের বইটি এডভান্স…..। হুমায়ুন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। নাদের আলী রসায়নে অধ্যয়ন অবস্থায় সাইকোলজিতে ভর্তি হয়। নাদের আলী আর নন্দিতার প্রেম ও পরিনয়ে তেমন কোন ঘাত-প্রতিঘাতের উলেখ নেই উপন্যাসটিতে। হুমায়ন আহমেদ উর্ধ্ব জগতে বসে গল্প, উপন্যাস , নাটক, সিনেমা লিখছেন। নাটকে জমিদার মিয়া সাব কন্যাদেবী নামে এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেন। বিয়ের দশ বছর পরও মিয়া সাবের সংসারে কোন সন্তান আসেনা। অনেকদিন পর একরাতে স্বপ্নে মিয়া সাব এক দরবেশের সাক্ষাৎ পান। সাক্ষাতে দরবেশ বলেন, তুই অতিসত্ত¡র পিতা হবি। তবে শর্ত, তোর জলসা ঘর বন্ধ করে দিতে হবে। বাড়ির আঙ্গিনায় একটি পাকা মসজিদ তৈরী করে দিবি। স্বপ্নে দেখার পর মিয়া সাবের স্ত্রী গর্ভবতী হন এবং একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। দরবেশের শর্ত অনুযায়ী মিয়া সাব জলসা ঘর বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় একটি সুন্দর মসজিদ তৈরী করে দেন। আটরশি থেকে একজন ধর্মানুরাগী লোক এসে মসজিদ পরিস্কার করেন। তিনি মসজিদে ইমামতি করবেন এবং কবর চিলা দিবেন। পাচঁজন হাফেজ মসজিদের বারান্দায় বসে কুরআন খতম শুরু করেন ইত্যাদি বিষয় উপন্যাসের কাহিনীতে চলে আসে। ধর্মীয় উপাসনা, কুরআন খতম, প্ল্যানচেট, সাইন্স ফিকশন, উর্ধ্ব জগতে বসে হুমায়ুন আহমেদের গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সিনেমার কাহিনী লেখা, সেখানে গিয়ে কবি নজরুল, রবীন্দ্রনাথ,সেক্সপীয়ার, মধুসুদন, হেনরি মিলার, লিওনার্দো ভিঞ্চি, শেখ মুজিব এবং কিছু আত্মীয় স্বজনকে দেখতে পান। তবে সবাই ওখানে ভাল নেই। রবীন্দ্রনাথ উর্ধ্ব জগতে গিয়ে অনেক গল্প , উপন্যাস আর কবিতা লিখে সেগুলো পৃথিবীতে পাঠাতে আত্মা নিবার্চন করেও ব্যর্থ হন। লিওনার্দো ভিঞ্চি উর্ধ্ব জগতে ফিরে যাওয়ার আগে দু’টি অসমাপ্ত চিত্রকর্ম রেখে যান। চিত্রকর্ম দু’টি উর্ধ্ব জগতে গিয়ে আবার আঁকেন এবং পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য একটি আত্মাকে র্নিবাচন করেন (কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস!) আত্মা পৃথিবীতে স্থান পায় না। প্ল্যানচেটের মাধ্যমে নাদের আলী নূহাশ পল্লীর বাড়ীতে হুমায়ুন আহমেদকে হাজির করে। ঝড়ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ সেদিন রাতে নাদের আলীর সাথে কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথোপকথন হয়।

উপন্যাসটির কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র র্নিবাচন, উপস্থাপন, সংলাপ ও শব্দ চয়ন এবং প্রকাশভঙ্গির সাথে হুমায়ন আহমদের লেখনী বৈশিষ্টের সামঞ্জস্য বা মিল খোঁজে পাওয়া যায়। লেখক এদিকটি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলে খুব ভাল করতেন। কিছু মূদ্রণ প্রমাদ ব্যতীত বইটির অঙ্গসৌষ্ঠব ভালই হয়েছে। তারপরও উপন্যাসটি পাঠককে ভাবিয়ে ছাড়বে। সুখপাঠ্য তো বটেই। একটু সময় করে নিলেই বইটি পড়ে ফেলা যায়। হুমায়ুন প্রেমীরা বইটি একাধিকবার পড়তে আগ্রহী হবেন। পাঠক প্রিয়তা কামনা করি।
পরিচিতি:
খ.ম.রোকন-উদ-দ্দৌলাহ ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই ময়মনসিংহ শহরের এস,কে, হাসপাতালের ৩২ নং প্রসূতি ওয়ার্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মো:মজিবর রহমান জামালপুর সরকারী আশেক মাহমুদ কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। মাতা রোকেয়া বেগম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকা। প্রেরণা: কবি শামসুল ফয়েজ, কবি ও সাংবাদিক তালাত মাহমুদ। তিনি ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে জামালপুর জেলা স্কুল থেকে এসএসসি ও সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সমাপ্ত করেন। অতপর তিনি উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি র্নিবাহী প্রকৌশলী হিসাবে জামালপুরের তারাকান্দি যমনা সার কারখনায় কর্মরত আছেন। তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার একজন গৃহিণী। তিনি ১কন্যা ও ১পুত্র সন্তানের জনক। রোকন-উদ-দ্দৌলাহ তার পরবর্তী গ্রন্থসমূহ প্রকাশ করে পাঠক প্রিয়তার উত্তরোত্তর সম্বৃদ্ধি ঘটাবেন- এই প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক :কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




