ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জিততে ব্রাজিলের অপেক্ষাটা ২৪ বছরের। নামে-ভারে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্কোয়াড কোনো আসরে সেই অর্থে দুর্বল ছিল না। তবে ২০০২ সালের পর থেকে চ্যাম্পিয়ন আইকন হয়ে উঠতে পারেননি কেউই। এবারও দলে প্রমাণিত ও অভিজ্ঞ পারফর্মার আছেন, আশা দেখাচ্ছেন নেইমার-ভিনিসিয়ুসরা। তবে সেলেসাওদের গন্তব্য নির্ধারিত হবে কার্লো আনচেলত্তির ভ্রু’র নাচনে!

ক্লাব ফুটবলে ভ্রু নাচিয়েই কার্লো ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দিতে পারেন বলে কথা প্রচলিত আছে। মাঠের পরিসংখ্যানও কথা বলে তার পক্ষে, এর বাইরে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিদের এবার বুকভরা আশার পালে হাওয়া দিচ্ছেন ডন কার্লো। সাম্প্রতিক অতীতে ব্রাজিল ফুটবল দলের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলা রোনালদিনহোরাও এখন উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন বিশ্বকাপ গ্যালারিতে। অথচ কাতার বিশ্বকাপ শেষে ২০২৩ সালের পর থেকে পরিস্থিতি ছিল নাজুক। ওই সময়ে ব্রাজিল দলে অন্তত একটি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৮৪ জন এবং কোচ বদলেছে চারবার।
বারবার দিক পরিবর্তনের পর অবশেষে বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের কোচ হিসেবে পেয়েছে কার্লো আনচেলত্তিকে। ইতালিয়ান এই কোচ ২০২৫ সালের জুনে সাম্বা বয়দের দায়িত্ব নেন। যদিও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কনমেবল অঞ্চলে আনচেলত্তির হাতে ছিল মাত্র চারটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। এর মধ্যে দুটি ম্যাচ ছিল কেবলই আনুষ্ঠানিকতার, কারণ ততদিনে ব্রাজিল বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছিল। তাই বাছাইপর্ব শেষ হওয়ার পর সাতটি প্রীতি ম্যাচেই মূলত তার পরিকল্পনার বড় অংশ তৈরি হয়েছে।

রিয়াল মাদ্রিদে লম্বা সময় মাথার ছায়া হিসেবে আনচেলত্তিকে পেয়েছিলেন রদ্রিগো গোয়েস। চোটের কারণে এই মুহূর্তে মাঠের বাইরে থাকা এই ব্রাজিল ফরোয়ার্ড জানিয়েছেন, ‘কার্লোর অধীনে খেলোয়াড় হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা অনেক। আমি মনে করি, খেলোয়াড়দের জন্য তার কৌশল বোঝা তুলনামূলক সহজ। কারণ ফুটবলের প্রকৃত বাস্তবতা ক্যামেরার সামনে নয়, বরং পর্দার আড়ালেই তৈরি হয়।’
‘সাংবাদিক কিংবা ড্রেসিংরুমের বাইরের মানুষের জন্য আনচেলত্তি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা অনুমান করা কঠিন। তারা হয়তো একটি পথ আশা করেন, কিন্তু তিনি বেছে নেন অন্য পথ। তাই তার চিন্তাভাবনা বুঝতে গিয়ে তাদের বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক’, আনচেলত্তি কী ভাবছেন তা বাইরে থেকে অনুমান করা কঠিন বলেও ভাষ্য রদ্রিগোর। ক্লাব ফুটবলে আনচেলত্তির একমাত্র কোচ হিসেবে ৫টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগ থেকেই শিরোপা জয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তি তো সবারই জানা।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিয়ে একটি অভিযোগ ছিল– তিনি রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়। মূলত ক্লাবের মতো পারফরম্যান্স জাতীয় দলে দেখাতে না পারায় ক্ষুব্ধ ছিলেন সেলেসাও সমর্থকরা। পরিসংখ্যানও অবশ্য সেই কথাই বলে। এবারের বিশ্বকাপটা সেই ভিনির হবে বলে চমক জাগানিয়া মন্তব্য করেছিলেন রিয়ালের সাবেক ও ব্রাজিলের বর্তমান কোচ আনচেলত্তি। সেই কথার প্রমাণ মিলেছে গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচে। যেখানে ব্রাজিল ছিল ভিনি–ময়, তিনি করেছেন ৪ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট।
এ ছাড়া ক্লাব ফুটবলে পারফর্ম করা তারকারা কেন জাতীয় দলে ফিনিশিং দুর্বলতায় ভুগছেন সেই প্রশ্নও ছিল অনেক দিনের। আনচেলত্তির বর্তমান ব্রাজিল স্কোয়াড সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেছে। তার ‘প্ল্যান-বি’ অনুসারে ম্যাথিউস কুনহা নম্বর নাইন হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অভিষেক আসরে নেমে করেছেন ৩ গোল। কেবল আক্রমণভাগই নয়, মাঝমাঠ এবং রক্ষণেও ব্রাজিলের কিছুটা শঙ্কার জায়গা ছিল। সেসব ক্ষতও ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলছেন আনচেলত্তি। রক্ষণে অভিজ্ঞ তারকা এডার মিলিটাও অনুপস্থিত থাকলেও, গ্যাব্রিয়েল মাঘালায়েস ও মার্কিনিয়োসের সঙ্গে দানিলো, ডগলাস সান্তোসরা মিলে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার কাজটা দায়িত্বের সঙ্গে সামলাচ্ছেন।
মিডফিল্ডে ব্রাজিল কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়ে চলেছেন ব্রুনো গুইমারেস। চলতি আসরে তিনি বল রিকভারি, ডুয়েল জেতা থেকে শুরু করে তিনটি গোলেও অ্যাসিস্ট করেছেন। ক্যাসেমিরো মাঝেমধ্যে খেই হারালেও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন অভিজ্ঞ এই তারকা। সঙ্গে আছেন লুকাস পাকেতা। আনচেলত্তি আক্রমণভাগে হয়তো রদ্রিগো-এস্তেভাওকে মিস করছেন, তবে তাদের শূন্যতা পূরণে খেলাচ্ছেন রায়ানের মতো তরুণকে। ইগর থিয়াগোকে সুযোগ দিলেও তিনি ঠিক কার্যকর হতে পারেননি। তবে আক্রমণভাগে সুযোগ হাতছাড়া না করলে গ্রুপপর্বে ব্রাজিলের গোলসংখ্যাটা (৭) আরও বাড়তে পারত।
ব্রাজিল কোচের অধীনে লুইজ হেনরিক, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ও এন্ড্রিকের মতো বিকল্প আছে। যদিও তিনি তাদের এখনও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খুব একটা সামনে আনছেন না। আর প্রতিপক্ষের ব্লকের সামনে ভরসা হয়ে উঠতে পারেন দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরা নেইমার। মাত্র ১৫ মিনিটের উপস্থিতিতে তিনি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি সুযোগ তৈরি করেছেন। জাপানের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তাকে আরও বাড়তি সময় দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে আনচেলত্তির বক্তব্যে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা এই গোলদাতাকে (৭৯) ফিট থেকে বাকি সময়ে খেলতে দেখাই হবে ভক্তদের আশার পূর্ণতা।
সান্তোসের হয়ে মাত্র ৪৩ ম্যাচ খেলেও নেইমার ছিলেন দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৭)। সর্বোচ্চ ড্রিবলের (৬৭) সাফল্য, সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরি (১১৪), সবচেয়ে বেশি শট (১১৮) এবং সবচেয়ে বেশি ফাউল আদায় করা খেলোয়াড় (১৬০)। অ্যাসিস্টে (৮) ও প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শেও (১৮৭) ছিলেন দ্বিতীয় সেরা। তাও এমন একটি দলের হয়ে, যারা অবনমন এড়ানোর লড়াই করছিল। নেইমার ইতোমধ্যেই ব্রাজিল কিংবদন্তির সারিতে আছেন। তবে এই বিশ্বকাপে তার সামনে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ আছে, পেলের পাশে নাম তুলতে পারেন দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করে।
আজ (সোমবার) রাত ১১টায় শেষ ৩২–এর ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে নামবে ব্রাজিল। পা হড়কালেই ভেস্তে যাবে সব আশা। তবে চাপের মুহূর্ত যত এগিয়ে আসছে, ততই আনচেলত্তি ব্রাজিল দলের সকল সতীর্থ থেকে শুরু করে ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সমর্থকদের আশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবেন বলে দাবি রদ্রিগোর। তার মতে– ‘আনচেলত্তি আমাদের কাছে বাবার মতো। কোচ ও মানুষ উভয় দিক থেকেই আমি তাকে অনেক শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, মাঠের এবং মাঠের বাইরের বিষয়েও পরামর্শ দেন। পরিবার নিয়ে আলোচনা, অসন্তোষ দূর করার কথা, কিংবা সঠিক পথ দেখাতে কঠোর হওয়ার মুহূর্তগুলো তিনি সামলান নিখুঁতভাবে।’
ব্রাজিলের বাইরেও যে আনচেলত্তির উপরেই জোরালো ভরসার জায়গা তৈরি হয়েছে– তা টের পাওয়া যায় দ্বিতীয় দফায় রিয়ালের কোচিংয়ে ফেরা হোসে মরিনিয়োর কথায়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মরক্কোর সঙ্গে ড্রয়ের মতো খারাপ ফলের পরও কার্লো বিচলিত হন না। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি, কার্লো পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।’




