ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা বিপ্লবী রবি নিয়োগীর ১১৪তম জন্মবার্ষিকী আজ (৩০ এপ্রিল মঙ্গলবার)। ১৯০৯ সালের এই দিনে শেরপুর শহরের পুরাতন গরুহাটি এলাকায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বলিয়ান এই বিপ্লবী জন্মগ্রহণ করেন।

মানবমুক্তির লড়াইয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে তেভাগা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে রবি নিয়োগী বিভিন্ন মেয়াদে ৩৪ বছর কারাভোগ করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি আন্দামান নির্বাসন দণ্ডও খেটেছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা সৈনিক কমরেড রবি নিয়োগী শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। দৈনিক সংবাদে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র এবং সমাজের অসংগতি তুলে ধরে সমাজ সংস্কারে অবদান রেখেছেন তিনি। ২০০২ সালের ১০ মে এই মহান বিপ্লবী ইহলোক ত্যাগ করেন।
জানা যায়, বিপ্লবী রবি নিয়োগী ১৩১৬ সালের ১৬ বৈশাখ শেরপুর টাউনের গৃর্দানারায়ণপুর মহল্লাস্থ এক ধনাঢ্য ভূ-স্বামী পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রমেশ চন্দ্র নিয়োগী, মা সুরবালা নিয়োগী। বিপুল বিত্তবৈভবের মধ্যে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করলেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তীতে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের বন্ধুর পথ। তাদের পরিবার ধনাঢ্য হলেও ওই পরিমণ্ডলে সাংস্কৃতিক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ ছিল। পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী সম্পত্তি দেখাশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি গণপাঠাগার নামে একটি পাঠাগার পরিচালনা করতেন।

১৯৩০ সালে শেরপুরে কংগ্রেসের ডাকে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়। ওই আন্দোলন চলাকালে রবি নিয়োগী, জীতেন সেন, প্রমথ গুপ্ত, হেমন্ত ভট্টাচার্য, বিশ্বনাথ মোদক, জলধর পাল, ঠাকুর দাস বসাকসহ ১৭ জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩ মাস কারাদণ্ড দেয়া হয়। রবি নিয়োগীর এটাই প্রথম জেলে যাওয়া। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে জীবনের প্রায় ৩৪ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। কিন্তু তিনি তার নীতি আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি।
শেরপুর-জামালপুর অঞ্চলে বৃটিশবিরোধী নানা সশস্ত্র তৎপরতায় তার বিরুদ্ধে সক্রিয় এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৯৩১ সালে বৃটিশ সরকারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বিচারে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ময়মনসিংহে জেলে থাকার সময় তিনি অন্যান্য রাজবন্দীদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ওইসময় রাজবন্দী ও সাধারণ কয়েদীদের একই মর্যাদা দেয়া হতো। ওই আন্দোলনের কারণে রবি নিয়োগীকে রাজশাহী জেলে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তাকে ফাঁসির আসামিদের সঙ্গে কনডেম সেলে রাখা হয়। ওইসময় রাজশাহী জেলে কারাবন্দী কয়েদীরা ইংরেজ জেল সুপারকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। এরই ফলশ্রুতিতে রবি নিয়োগীসহ বেশ কিছু সংখ্যক কারাবন্দীকে কোলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। রবি নিয়োগীকে বিপজ্জনক রাজবন্দী হিসেবে চিহ্নিত করে তার নামের সঙ্গে দু’টো তারকা চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়। এরই জের ধরে রবি নিয়োগীসহ ২৫ জন রাজবন্দীকে আন্দামানের সেলুলার জেলে দীপান্তরে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ১৯৩৬ সালে তিনি মুক্তি পান।
১৯৩৮ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু শেরপুরে আসেন এবং জনসভায় ভাষণ দেন। ওই সভায় রবি নিয়োগী সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। কিন্তু অন্তরীণ অবস্থাতে তিনি বৃটিশ গোয়েন্দাদের শ্যেন চক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন।
১৯৪৫ সালে তিনি নেত্রকোনায় সর্বভারতীয় কৃষক সভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে টংক প্রথার বিলোপ ও তেভাগার মাধ্যমে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এসব আন্দোলনের কারণে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত জেল খেটে ৫ বছর পর তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানি সরকারের ৯২ (ক) ধারা জারির পর ২ বছর কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের আমলে ৭ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খানের আমলে ৬ মাস আটক থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আমল ও শেখ হাসিনার আমল ছাড়া অন্য সব শাসকের আমলে তাকে জেল খাটতে হয়েছে। ১৯৬৩ সালে রবি নিয়োগী জেলখানায় থাকাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শেরপুর আসেন এবং তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৯১ সালে ভারতের বিপ্লবী সাভাকর স্মৃতি ট্রাস্ট এবং বাল গঙ্গাধর তিলক ট্রাস্ট আন্দামান ফেরত জীবিত কারাবন্দীদের এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ওই সম্মেলনে শেরপুরের রবি নিয়োগী ও বগুড়ার ডা. আব্দুল কাদের চৌধুরী যোগ দেন।
বিপ্লবী রবি নিয়োগী সব সময়ই বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার অনুসৃত রাজনৈতিক আদর্শ নীতি অনুসরণ করে গেছেন। শাসক-শোষক শ্রেণির শত নির্যাতন হয়রানি ও অপপ্রচারেও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে হননি। তাঁর অন্যান্য সহকর্মীদের অনেকেই দেশত্যাগ করলেও তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে কোথাও যাননি। তিনি বলতেন ‘ভীরুরা সামান্য সুখের আশায় দুখিনী মা’কে ত্যাগ করে’। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, জীবদ্দশায় কেবল স্বীয় এলাকায় বিপ্লবী রবি নিয়োগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান হলেও আর কোথাও উঠেনি তার নামটি। সেইসাথে সর্বত্যাগী এ রাজনীতিবিদের ললাটে এখনও জুটেনি কোন রাষ্ট্রীয় পদক।




