শেরপুরের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারী নেতা আন্দামান ফেরত এবং মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক বিপ্লবী রবি নিয়োগীকে স্বাধীনতা পদক প্রদানের দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সন্তান ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ।

১১ মার্চ সোমবার সকালে শেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল খায়রুমের কাছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
ওইসময় জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর সদস্য ডা. হেফজুল বারী খান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সন্তান সহযোগী অধ্যাপক শিব শংকর কারুয়া শিবু, জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম সদস্য মো. হারেজ আলী, এ্যাডভোকেট সুরুজ্জামানসহ অন্যান্য সচেতন মহল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল খায়রুম ওই সময় তাদেরকে স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তথ্যাদি জমা দেওয়ার জন্য বলেন এবং পরে তিনি ওইসব কাগজপত্র বিবেচনাপূর্বক আগামী বছরের জন্য পদক প্রাপ্তির প্রস্তাবনা পাঠাবেন বলে তিনি আশ্বাস দেন।
জানা যায়, বিপ্লবী রবি নিয়োগী ১৩১৬ সালের ১৬ বৈশাখ শেরপুর শহরের গৃর্দানারায়ণপুর মহল্লাস্থ এক ধনাঢ্য ভূ-স্বামী পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রমেশ চন্দ্র নিয়োগী, মা সুরবালা নিয়োগী। বিপুল বিত্তবৈভবের মধ্যে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করলেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তীতে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের বন্ধুর পথ। তাদের পরিবার ধনাঢ্য হলেও ওই পরিমণ্ডলে সাংস্কৃতিক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ ছিল। রবি নিয়োগীর পিতা গণপাঠাগার নামে একটি পাঠাগার পরিচালনা করতেন।
১৯৩০ সালে শেরপুরে কংগ্রেসের ডাকে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হলে রবি নিয়োগী, জীতেন সেন, প্রমথ গুপ্ত, হেমন্ত ভট্টাচার্য, বিশ্বনাথ মোদক, জলধর পাল, ঠাকুর দাস বসাকসহ ১৭ জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩ মাস কারাদণ্ড দেয়া হয়। রবি নিয়োগীর এটাই প্রথম জেলে যাওয়া। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে জীবনের প্রায় ৩৪ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। কিন্তু তিনি তার নীতি আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি।
শেরপুর-জামালপুর অঞ্চলে বৃটিশবিরোধী নানা সশস্ত্র তৎপরতায় তার বিরুদ্ধে সক্রিয় এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৯৩১ সালে বৃটিশ সরকারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বিচারে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ময়মনসিংহে জেলে থাকার সময় তিনি অন্যান্য রাজবন্দীদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ওইসময় রাজবন্দী ও সাধারণ কয়েদীদের একই মর্যাদা দেয়া হতো। ওই আন্দোলনের কারণে রবি নিয়োগীকে রাজশাহী জেলে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তাকে ফাঁসির আসামিদের সঙ্গে কনডেম সেলে রাখা হয়। ওইসময় রাজশাহী জেলে কারাবন্দী কয়েদীরা ইংরেজ জেল সুপারকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। এরই ফলশ্রুতিতে রবি নিয়োগীসহ বেশ কিছু সংখ্যক কারাবন্দীকে কোলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। রবি নিয়োগীকে বিপজ্জনক রাজবন্দী হিসেবে চিহ্নিত করে তার নামের সঙ্গে দু’টো তারকা চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়। এরই জের ধরে রবি নিয়োগীসহ ২৫ জন রাজবন্দীকে আন্দামানের সেলুলার জেলে দীপান্তরে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ১৯৩৬ সালে তিনি মুক্তি পান।
১৯৩৮ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু শেরপুরে আসেন এবং জনসভায় ভাষণ দেন। ওই সভায় রবি নিয়োগী সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। কিন্তু অন্তরীণ অবস্থাতে তিনি বৃটিশ গোয়েন্দাদের শ্যেন চক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন।
১৯৪৫ সালে তিনি নেত্রকোনায় সর্বভারতীয় কৃষক সভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে টংক প্রথার বিলোপ ও তেভাগার মাধ্যমে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এসব আন্দোলনের কারণে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত জেল খেটে ৫ বছর পর তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানি সরকারের ৯২ (ক) ধারা জারির পর ২ বছর কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের আমলে ৭ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খানের আমলে ৬ মাস আটক থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আমল ও শেখ হাসিনার আমল ছাড়া অন্য সব শাসকের আমলে তাকে জেল খাটতে হয়েছে। ১৯৬৩ সালে রবি নিয়োগী জেলখানায় থাকাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শেরপুর আসেন এবং তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৯১ সালে ভারতের বিপ্লবী সাভাকর স্মৃতি ট্রাস্ট এবং বাল গঙ্গাধর তিলক ট্রাস্ট আন্দামান ফেরত জীবিত কারাবন্দীদের এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ওই সম্মেলনে শেরপুরের রবি নিয়োগী ও বগুড়ার ডা. আব্দুল কাদের চৌধুরী যোগ দেন।
বিপ্লবী রবি নিয়োগী সব সময়ই বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার অনুসৃত রাজনৈতিক আদর্শ নীতি অনুসরণ করে গেছেন। শাসক-শোষক শ্রেণির শত নির্যাতন হয়রানি ও অপপ্রচারেও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে হননি। তবে তার জীবদ্দশায় কেবল নিজ এলাকায় বিপ্লবী রবি নিয়োগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান হলেও আর কোথাও উঠেনি তার নাম। সেইসাথে তার ভাগ্যে এখনও জুটেনি কোন রাষ্ট্রীয় পদক।




