শেরপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৬ হাজার ঘরবাড়ি ॥ ক্ষতিগ্রস্তদের মানবেতর জীবনযাপন
‘ঢলে আমার তিনটা ঘর ভাইঙ্গা ধইসা গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। তিনদিন ধইরা না গুমাইয়া বইয়া থাহি। আমি অসহায় মানুষ। এহন কেমনে এই ঘর ঠিক করমু চিন্তা কইরা কূল পাইতাছি না।’- আক্ষেপের সুরে এমন কথা বলছিলেন সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ব্রিজপাড় এলাকার বাসিন্দা রাশেদা বেগম। স্বামী ও পুত্র সন্তানহীন স্বল্প আয়ের বিধবা রাশেদার একটি থাকার ঘর, একটি পাকের ঘর ও একটি গোয়ালঘরের সবই ঢলের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ফিকে হয়ে উঠেছে তার বাঁচার স্বপ্ন। কেবল রাশেদাই নয়, রাশেদার মতো টানা প্রবণ বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ঘরবাড়ি ভেসে গেছে এবং ভেঙে ধ্বসে গেছে। বুধবার থেকে বন্যার পানি কমার সাথে সাথে ভেসে উঠছে সেইসব ক্ষত। ফলে এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সরেজমিনে গেলে কথা হয় ঝিনাইগাতী সদরের ব্রিজপাড় এলাকার বাসিন্দা জুলেখা বেগমের সাথে। তিনি জানান, ঢলের প্রথম ধাক্কাতেই শেষ সম্বল আমার ঘর-বাড়ি ভাইসা গেছে। এহন থাহার জাগা নাই। খাওনেরও কিছু নাই। কিভাবে ঘর তুলমু, কি খামু এইডা নিয়াই ভাবতাছি। নালিতাবাড়ী উপজেলার খলিশাকুড়া গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ঢলের দিন আমার ছোট মেয়েটাকে কোনরকমে ঘাড়ে নিয়ে ঘরের খুটি ধইরা গলা সমান পানিতে সারারাত দাঁড়ায়া ছিলাম। মনে করছিলাম নিজেও বাঁচমুনা, আর মাইয়াটারেও বাঁচাতে পারমু না। চোখের সামনে ঘরের সব জিনিস ভাসায়া নিয়ে গেছে, কিচ্ছু বাঁচাইতে পারি নাই। অটো চালায়া সংসার চালাইতাম, সেইটাও নষ্ট হয়ে গেছে গা। এহন কি যে করমু বুঝতাছি না। একই এলাকার বাসিন্দা নাকুগাও স্থলবন্দরের শ্রমিক চিন্তাহরণ বলেন, আমি গরিব মানুষ দিন আইনা দিন খাই। আমার তিনটা ঘর ঢলে ভাইঙ্গা নিয়ে গেছে গা। ঘরের ধান-চাল সবই ভাসায়া নিয়ে গেছে গা। এখন কি খায়া বাঁচমু? সরকার আমগরে সাহায্য না করলে আর কোন উপায় নাই। আরেক বাসিন্দা জুলহাস বলেন, ঢলের পানিতে হাসমুরগিসহ ঘরের সব ভাসায়া নিয়ে গেছে গা। ছোট ছোট পুলাপান নিয়া কোনমতে জীবন বাঁচাইছি।
তাদের মতো এমন অসহায়ত্বের গল্প দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষের। দিন এনে দিন খাওয়া এসব দরিদ্র মানুষ তাদের পেটের ক্ষুধার চেয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে বেশি চিন্তিত। প্রশাসন বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে।

জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর শুক্রবার ভোররাত থেকে স্মরণকালের ভয়াবহ এক পাহাড়ি ঢল দেখেছে শেরপুরবাসী। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর বর্ষায় দুই তিনবার ঢলে ভাসলেও ইতিপূর্বে এমন তান্ডবলীলা কেউ দেখেনি আগে। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা ৪টি নদী পাড়ের মানুষ কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয় ঢল। গত তিনদিন থেকে বৃষ্টি না থাকায় ও উজানের পানি কমতেই ভেসে উঠছে তান্ডবলীলার চিত্র। এ বন্যায় জেলার ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার অন্তত সাড়ে ছয় হাজার মাটির কাঁচা, আধা পাকা ও পাকা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঢলের স্রোতের সামনে যা যা পড়েছে সব মিশিয়ে দিয়েছে মাটির সাথে, নয়তো নিয়ে গেছে ভাসিয়ে। সব হারিয়ে দিশেহারা এসব পরিবার। পানি কমায় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে নিজ ঘরে ফিরছে মানুষ, ভেঙে যাওয়া ঘর থেকে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন তারা।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল জানান, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্যে এ উপজেলায় ৫০০ ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং এক হাজারের মতো ঘর আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের সহায়তা করা হবে।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, এ উপজেলায় ৪ হাজার ৬৮টি ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও প্রায় ১২০০ ঘর আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে টিন ও নগদ অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে।




