শেরপুরে লঘু অপরাধে সামাজিক কাজ করিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মামলা থেকে দেড় শতাধিক অভিযুক্ত মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। বিচারকের ওই দণ্ডকে আইনজীবী, অভিযুক্তদের পরিবার ও সাধারণ মানুষ অভিনব মজার দণ্ড বলছেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আল মামুনের অনুমতি নিয়ে ওই অভিনব দণ্ড দিয়ে অভিযুক্তকে মুক্তির ব্যবস্থা কার্যক্রম শুরু করেছেন শেরপুরের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এস এম হুমায়ুন কবীর। আর তার অধস্তন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর আল মামুনসহ কয়েকজন বিচারক পরিচালনা করছেন লঘু দণ্ড দিয়ে অপরাধীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সুযোগ দেওয়ার কাজটি।

শেরপুরে বছরখানেক ধরে ওই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অভিযুক্তকে গাছ লাগানো, মাস্ক বিতরণ, মা-বাবার সেবা, ধর্ম পালন, মানুষের সাথে ভাল আচরণ, নেশার বিরুদ্ধে প্রচারণার মত কাজে এক বছর নিয়োজিত রেখে এবং পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে মামলা থেকে অব্যাহতির দেওয়ায় প্রক্রিয়া চলছে। এ বছর জেলায় শতাধিক মামলায় দেড় শতাধিক অভিযুক্ত ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে আসবে। ফলে কমবে মামলার জট। আর অভিযুক্তদের পরিবারও পাবে স্বস্তি। আবার পরিবেশ ও সামাজিক সংক্রান্ত কাজও হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বন্যায় কিছু গাছ নষ্ট হওয়ায় মন খারাপ হয়েছে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, যেসব অভিযুক্ত সর্বোচ্চ ৭/৮ টি ইয়াবা, সামান্য গাঁজা ও হালকা নেশাসেবনের মত লঘু অপরাধে হাজতবাস বা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, তারা ওই দণ্ডের মধ্যে পড়বেন। তবে ওইসব মামলার অভিযুক্তদের আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করতে হবে এবং আদালতের দেওয়া শর্ত মানতে হবে। অন্য কোন জটিল নেশা নিয়ে ধরা পড়া অভিযুক্তরা এই শাস্তির আওতায় আসবে না। এই শাস্তির আওতায় আসা অভিযুক্তরা জীবনে আর কোন নেশা খাবে না, আদালতের কাছে এমন অঙ্গীকার করলে আদালত এক বছর বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। আর এই পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলার প্রবেশন কর্মকর্তাকে (পরীক্ষাকাল কর্মকর্তা)। এই কর্মকর্তা জেলার অপরাধীর চরিত্র সংশোধনের কাজে নিয়োজিত থাকেন। এই শাস্তির আওতায় অভিযুক্তকে এক বছর নিজ খরচে গাছ লাগানো, মাস্ক বিতরণসহ আত্মসংশোধনমূলক উপরোক্ত সামাজিক কর্মগুলো করবে। আদালত অপরাধের ধরণ বিবেচনায় শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করে। অভিযুক্তের এই সামাজিক সেবার কাজটি কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন আদালতের নিয়োজিত কম্পিউটার ও মুদ্্রাক্ষরিক আব্দুর রউফ নামে একজন কর্মচারী। অভিযুক্তদের চলাফেরা ও আদালতের দেওয়া নির্দেশ পালন করছে কিনা এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রতিমাসেই ওই প্রবেশন কর্মকর্তা আদালতে জমা দেন। তবে এক বছর পরে এই বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্টের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে ওদের ভাগ্য। এমন বাৎসরিক শতাধিক জনের রিপোর্ট কিছুদিনের মধ্যেই আদালতে পাঠানো হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

মুদ্রাক্ষরিক আব্দুর রউফ জানান, প্রতিদিন বিচারককে অভিযুক্তদের বিষয়ে আপডেট দিতে হয়। এমন দায়িত্ব পালন কষ্ট হলেও আনন্দ আছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের নাজির সাইফুল ইসলাম জানান, এ ব্যবস্থাও এক ধরনের শাস্তি। এই শাস্তিটি অভিযুক্তকে জেলখানার মধ্যে না রেখে পরিবারের সাথে রেখে কঠিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এমন একাধিক মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট আলমগীর কিবরিয়া কামরুল জানান, আদালতের এই ব্যবস্থায় অসংখ্য অভিযুক্ত নানা সামাজিক কাজের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম ভাসানী জানান, আইনের মধ্যেই অভিযুক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিসে আসার এই উদ্যোগ বেশ প্রশসংনীয় হয়েছে। আমার জানামতে, এই সুযোগ অনেকেই গ্রহণ করেছে।
দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রবেশন কর্মকর্তা মো. হাসান কিবরিয়া জানান, এ সংক্রান্ত আইন ‘প্রবেশন অব অফেন্ডারস অর্ডিন্যান্স-১৯৬০’ থাকলেও কার্যক্রম ছিলো না। এখন এ আইনের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় তা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। এই আইনের মাধ্যমে লঘু অপরাধের জন্য কঠোর ও ভীতিপ্রদ শাস্তি না দিয়ে সমাজের কাছাকাছি রেখে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার মাধ্যমে অপরাধীকে সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়। তার মতে, এ ব্যবস্থায় অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। তবে লোকবল সংকটের কারণে পর্যবেক্ষণ করা বেশ জটিল হয়ে উঠছে।




