‘বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। সরকার আমাদের সুবিধাও দিয়েছে অনেক। তবে জীবনেও ভাবতে পারি নাই স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর পর এসে আজকে আমার মা আম্বিয়া খাতুনকে এইভাবে সম্মানীত করা হবে। প্রথমবারের মতো এরকম একটি আয়োজন করায় আমরা খুব খুশি হয়েছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গর্বিত। সেইসাথে এমন আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ এভাবেই নিজের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার কাকিলাকুড়া এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কালাম আজাদ।

২ এপ্রিল শনিবার সকালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সহযোগিতায় এবারই প্রথম জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষ রজনীগন্ধায় জেলার জীবিত ২৪ মা-বাবাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে সম্মানীত করা হয়। সেইসাথে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় শাড়ি, পাঞ্জাবি, জায়নামাজ, টুপি, তসবিহসহ কাপড়-চোপড়সহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। আর জীবনের শেষ বয়সে প্রথমবারের মতো এভাবে সম্মানীত হতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। সেইসাথে বীর মুক্তিযোদ্ধারাও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
নালিতাবাড়ী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অনেকেই বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে গেছেন, আবার অনেকেই পালিয়ে না বলেই যুদ্ধে গেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাদের অবদান ও ত্যাগও অনস্বীকার্য। আজকে তাদের সংবর্ধনা দেওয়ায় সেই ত্যাগের মূল্যায়ন তিনি পেয়েছেন। এজন্য আমি গর্ববোধ করছি। একই কথা জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল ইসলাম, মো. মজিবর রহমানসহ অনেকেই।

এ উপলক্ষে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ বলেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ওই আত্মত্যাগে ভূমিকা রয়েছে তাদের মা-বাবাদেরও। তাই জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে এবারই প্রথম তাদের সম্মানীত করা হল। এখন থেকে জাতীয় দিবসগুলোতেও তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এছাড়া তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য শিগগিরই হেলথ কার্ড করে দেওয়া হবে। প্রতি মাসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাথা পিছু ২ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা করা হবে এবং যাদের ঘরনেই, তাদের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তিনি অন্যান্য জেলাতেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানান।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, আমার জানামতে দেশের কোথাও এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মা-বাবাকে সংবর্ধনা বা সম্মাননা দেওয়া হয়নি। অথচ তারাও দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের এই ত্যাগকে মূল্যায়ন করতে মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন এই উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতি বছরই এ ধরনের আয়োজন করা হবে। আশা করছি দেশের অন্যান্য জায়গাতেও পর্যায়ক্রমে এই ধরনের আয়োজন হবে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইয়েদ এজেড মোরশেদ আলী, শেরপুর পৌরসভার মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুকতাদিরুল আহমেদ, নালিতাবাড়ীর পৌর মেয়র মো. আবু বকর সিদ্দিক, শ্রীবরদী পৌর মেয়র মোহাম্মদ আলী লাল, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ-গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. সুধাময় দাস, লালন গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদেল মান্নান, নকলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, শেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শিবশঙ্কর কারুয়া শিবু, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোবারক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম জিন্নত আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনসুর, বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমেজ উদ্দিন, সাংবাদিক দেবাশীষ ভট্টাচার্য প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।




