গ্রামের সহজ সরল এক মেয়ে নূপুর আক্তার (২২)। মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়াবস্থায় বিয়ে হয়েছিল তার। আর সেই স্বামীর দেওয়া আগুনে শরীরের ৬০ ভাগ পুড়ে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই লড়ছেন নূপুর। স্বামী নাজমুল হোসেনের দেওয়া আগুনে ঝলসে গিয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন সমাজের বিত্তবানদের কাছে। সেইসাথে চান পাষণ্ড স্বামীর কঠিন শাস্তি।

শেরপুরের নকলা উপজেলান গণপদ্দি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের দিনমজুর তোতা মিয়ার একমাত্র কন্যা সন্তান নূপুর আক্তার। তিনি জানান, অভাবের কারণে আমার একমাত্র সন্তান নূপুরকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াবস্থায় নকলা সদরের দরবেশ আলীর ছেলে নাজমুলের সাথে বিয়ে দেই। কিছুদিন পর জানতে পারি নাজমুল মাদকাসক্ত। মাঝেমধ্যেই নেশার টাকার জন্য মেয়েকে মারধর করতো। এভাবে চলতে থাকে কয়েক বছর। এরই মধ্যে তাদের সংসারে আসে ফুটফুটে নাতি। নেশার টাকা নেই, টাকা যোগাতে পাষণ্ড নাজমুল ৪ মাসের শিশু সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। দুধের শিশুকে বিক্রি করেছে স্বামী, রাগে-ক্ষোভে নাজমুলকে তালাক দিয়ে চলে আসে আমার মেয়ে। পরে জীবন-জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় একটি পোশাক তৈরির কারখানায় চাকরি নেয় নূপুর।
২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর। আমার নিরীহ মেয়ে নূপুর কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিল, ওঁৎ পেতে থাকা পাষণ্ড নাজমুল পেট্রোল ঢেলে নূপুরের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে সঙ্গে থাকা পোশাক কর্মীরা গুরুতর আহত নূপুরকে চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠায়। সেখানে শরীরের ৬০ ভাগ পোড়ার চিকিৎসা চলে দীর্ঘ ৪৫ দিন।
নূপুর বলেন, ক্লাসে নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলাম আমি। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, ইচ্ছা থাকার পরও স্বামী পড়তে দেয়নি। বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে, তাই অনেক যন্ত্রণা-বঞ্চনা সহ্য করেও নাজমুলের সংসার করেছি। যখন আমার দুধের সন্তানকে নেশার টাকার জন্য বিক্রি করে দিল, তখন আর ঠিক থাকতে পারিনি। তালাক দেওয়ায় নাজমুল পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে আমার পুরো শরীর ঝলসে দিয়েছে। আমি গত ২ মাস থেকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকি। কাপড় পরতে পারি না। সব সময় গা জ্বালা-পোড়া করে, ঘা হয়ে গেছে। আমি চাই, নাজমুলকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক।

স্থানীয় আকলিমা বেগম জানান, বিয়ের পর আমরা শুনলাম স্বামী নেশাগ্রস্ত। নেশার টাকার জন্য নূপুরকে মাঝেমধ্যেই মারধর করতো। শাশুড়িও নূপুরকে নির্যাতন করতো। এখন তো নূপুরের বেঁচে থাকাটায় শংকায়। পাষণ্ড নাজমুলের নাজমুলের ফাঁসি দাবি জানাচ্ছি। স্থানীয় ফিরোজ মিয়া বলেন, নূপুর এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। দরিদ্র বাবার টাকা যোগার করতে আর পারছে না। উন্নত চিকিৎসা না পেয়ে নূপুরের শরীর থেকে পুঁজ ও গন্ধ বের হচ্ছে। অসহায় নুপুর অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তার চিকিৎসায় সহায়তা চাই আমরা, আর পাষণ্ড নাজমুলের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান আনোয়ার-ই-তাসলিমা প্রথা বলেন, পাষণ্ড নাজমুল একজন সুস্থ সবল নূপুরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। জীবন্ত নূপুরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা করেছে। সন্তান বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা সেই পাষণ্ডর ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। আর জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা কিশোরী নূপুরের চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবানদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করছি।
নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, নূপুরের মামলাটি গাজীপুরে রয়েছে। নাজমুলের বাড়ি যেহেতু নকলা উপজেলায়। সেক্ষেত্রে নাজমুলকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে গাজীপুর থানা পুলিশকে আমরা সহযোগিতা করব।
সিভিল সার্জন ডা. অনুপম ভট্টাচার্য্য বলেন, নূপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হলে তার যাবতীয় দেখভাল আমরা করব। যদি সে উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে চায়, তাহলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নূপুরের পাশে থাকবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ জানান, ইতোমধ্যে নূপুরের চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। এবং নূপুরের যেকোনো প্রয়োজনে শেরপুর জেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।




