শেরপুরে ২ যুগে ৯৫ জন মানুষ ও ৩৫ হাতির মৃত্যু

অবশেষে শেরপুর সীমান্তের গারো পাহাড়ে হাতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনে টনক নড়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের। তারই আওতায় এবার ওই দ্বন্দ্ব নিরসনে গারো পাহাড়েই গড়ে তোলা হচ্ছে বন্য হাতির অভয়ারণ্য। এজন্য ইতোমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় অভয়ারণ্যের স্থান বা জায়গা নির্ধারণ এবং তার মালিকানা চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বন বিভাগ। পাশাপাশি বন বিভাগের তরফ থেকে জবর দখলে থাকা বনভূমিও উদ্ধারে চলছে কাজ। অন্যদিকে ফি বছর নানা প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার পরও এবার স্থায়ী কার্যক্রমের আওতায় অভয়ারণ্য গড়ে তোলার উদ্যোগে সন্তোষ বিরাজ করছে সচেতন মহলে। এর মধ্য দিয়ে প্রতি বছর হাতি মানুষের দ্বন্দ্বে প্রাণহানি এবং হাতির তান্ডবে কোটি কোটি টাকার ফসলও রক্ষা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেরপুর সদরসহ ৫ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার ৩টি উপজেলাই অর্থাৎ শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা এবং সে উপজেলাগুলোর বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত গারো পাহাড়। এক সময় এই বনাঞ্চলে অবাধে ঘুরে বেড়াতো বন্য হাতির দল। কিন্তু সীমান্তের ওইসব পাহাড়ি এলাকায় মানুষ দিন দিন বসতি গড়ে তোলায় ক্রমেই বন্ধ হয়ে যায় হাতির চলাচল। এতে প্রতি বছরই সীমান্তের ওপার থেকে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসছে হাতির দল। আর তখনই শুরু হচ্ছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে গত ৩ মাসের ব্যবধানে গারো পাহাড়ে ৪টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ২ যুগে বছরে নানা কারণে জেলায় প্রায় ৩০/৩৫টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে বন্য হাতির আক্রমণে জেলায় মারা গেছে প্রায় ৯৫ জন মানুষ। আর আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এছাড়া ফসল-বাড়িঘরসহ কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন আরও প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ।
অন্যদিকে সীমান্তের ওইসব পাহাড়ি এলাকায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে মাঝে-মধ্যেই বেতবাগান, বড়ই বাগান, ও সোলার ফেন্সিং নামে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে সরকার, বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কোটি কোটি টাকা। বিশেষ করে সর্বশেষ সোলার ফেন্সিংয়ের বৃহৎ প্রকল্পে সফলতা না এলেও সম্প্রতি ফের কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয়েছে নতুন করে একই প্রকল্প। অবশেষে জেলা প্রশাসনের মতামত এবং জাতীয় পত্র-পত্রিকায় বিস্তর লেখালেখির সুবাদে দীর্ঘদিনের সেই দ্বন্দ্ব নিরসনের লক্ষ্যে এবার সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আগ্রহে নেওয়া হয়েছে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প। সম্প্রতি ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে শেরপুরে এসে দেশের প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান শেরপুর গারো পাহাড়ে বন্য হাতির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার কথা। তার মতে, সরকার সীমান্তের পাহাড় ও বনে হাতি-মানুষের সহাবস্থানের জন্য নানা পরিকল্পনার গ্রহণ করেছে। তারই আওতায় এবার গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্যের জন্য জরিপ কাজ শুরু করা হয়েছে।
গারো পাহাড়ে হাতির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার বিষয়ে সরেজমিনে গেলে কথা হয় শ্রীবরদীর বালিজুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, বালিজুড়ি, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী পর্যন্ত হাতির জন্য অভয়ারণ্য হবে। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন বিভাগের তরফ থেকে জমি নির্ধারণ ও মালিকানা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে জবর দখলে থাকা জমিগুলোও উদ্ধার শুরু করা হচ্ছে। আমরা আশা করি, গারো পাহাড়ের যে একটা ঐতিহ্য তা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরে আসবে।
স্থানীয়দের আশা, হাতিদের জন্য অভয়ারণ্য হলে কৃষকদের ফসলের কোনো ক্ষতি হবে না। পাশাপাশি বাড়ি-ঘরে হামলা করবে না হাতির দল। ঝিনাইগাতীর ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা আছমত আলী, সরুফা বেগম ও লাল চাঁন জানান, এ এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই হাতির দল আসে, এজন্য বেশিরভাগ সময় এ এলাকার মানুষ রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। যদি অভয়ারণ্য হয়, খুব ভালো হবে। ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, ভাই খুব একটা ভালো খবর দিলেন, আমরা খুব খুশি। কারণ আমাদের এ এলাকা গজনীর পাশাপাশি, এজন্য প্রায় প্রতিদিনই হাতির দল আসে এবং হানা দেয় বাড়ি-ঘরে। পরে আমরা ঢাক, ঢোল পিটিয়ে হাতির দলকে তাড়া দেই। নালিতাবাড়ীর পানিতাহা গ্রামের কৃষক আবুলহোসেন বলেন, (শুনতেছি) হাত্তির (হাতি) জন্য আস্তা (অভয়ারণ্য) হবো। কই হয় না তো, এল্লে (এগুলো) হুদাই। যদি আস্তা (অভয়ারণ্য) হয় তাহলেতো বালাই (ভালো) অইবো (হবে)। বালিজুড়ি এলাকার কৃষক রমজান আলী বলেন, বাপু হাত্তি (হাতি) যদি আমগর (আমাদের) ইতি (এদিকে) না আহে (আসে), তাইলেতো ভালাই অইবো। আঙগর (আমাদের) কোনো ক্ষতি অইবো না। সরহার (সরকার) যে সিস্টেম (উদ্যোগ) হাতে নিছে খুব বালা (ভালো) হবো। একই এলাকার আরেক কৃষক রহমত আলী বলেন, হুনতাছি (শুনছি) হাত্তির (হাতি) জন্য রাস্তা করবো। যদি রাস্তা করে তাইলে তো বালাই (ভালো) অইবো। আমরা শান্তিতে এল্লা (একটু) ঘুমাবার পামু, আমাদের ঘরে আর হাত্তি (হাতি) আইবো না।
প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলন, শেরপুর জেলা শাখার আহবায়ক মেরাজ উদ্দিন ও সদস্য সচিব সাবিহা জামান শাপলা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার জন্য দাবি করে আসছিলাম, অবশেষে সীমান্তে অভয়ারণ্য করার ঘোষণা এসেছে। এতে আমরা খুব খুশি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন হবে।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ বলেন, গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্য তৈরির প্রস্তাবটি পাস হয়ে বন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বন বিভাগে রয়েছে। ইতোমধ্যে তার প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি, অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পর হাতি-মানুষের দীর্ঘদিনের চলমান সংঘাত নিরসন হবে।




